অঞ্জন দত্তের বেলা বোস : শুধুই মিথ নাকি বাস্তবের চরিত্র?

রবিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২০ | ১১:০৬ অপরাহ্ণ | 14 বার

অঞ্জন দত্তের বেলা বোস : শুধুই মিথ নাকি বাস্তবের চরিত্র?

একজন বেলা বোস, বাঙ্গালি প্রেমিক হৃদয়ের চিরন্তন হাহাকারের প্রতীক তিনিও। অঞ্জনের বেলা বোস গানটার কারণে আমাদের কাছেও বেলা বোস কত কাছের, কত চেনা। কিন্তু আসলেই কি বেলা বোস নামে কেউ ছিলেন বাস্তবে? নাকি এ কেবলই এক মিথ? অঞ্জন নিজে কি বলেন এই ব্যাপারে?

বেলা বোসকে আর পাওয়া হয় না। চাকরিটা হবে হবে করে যে অপেক্ষা, সেই অপেক্ষাটাও একদিন ফুরায়। কিন্তু বেলা বোসকে পাওয়ার অপেক্ষা আর ফুরায় না। এই অপেক্ষার তীব্র আকুতি কানে লেগে থাকে আমাদের। প্লে লিস্টে অঞ্জন দত্তের ‘বেলা বোস’ চলতে থাকে। অজানা এক বেলা বোসের প্রতি আমাদেরও খানিক অভিমান হয় হয়ত। আমরাও এক বেকার প্রেমিক জীবনের হাহাকারের সাথে একাত্ম হয়ে যাই।

কোনো বাংলা গান এভাবে বেকার জীবন, মানব মানবীর চিরন্তন প্রেমকে এভাবে ধারণ করতে পারবে, এতো সহজ শব্দ দিয়ে ঝংকার তুলবে মনের দুয়ারে তা অবিশ্বাস্য। অঞ্জন দত্তের এই গান এখনো চিরন্তন। সেই যে একজন বেলা বোস, বাঙ্গালি প্রেমিক হৃদয়ের চিরন্তন হাহাকারের প্রতীক তিনিও এই গানের কারণে আমাদের কাছেও যেন চিরচেনা। কিন্তু আসলেই কি বেলা বোস নামে কেউ ছিলেন বাস্তবে? নাকি এ কেবলই এক মিথ? ২৪৪১১৩৯ বেলা বোসের সেই বিখ্যাত নাম্বার। গানের মধ্যে আমরা সকরুণ আকুতি শুনতে পাই। বেকার জীবনের ইতি ঘটিয়ে সদ্য এগারশো টাকার চাকরি পাওয়া তরুণ বলছে, পাবলিক টেলিফোনে মিটার যাচ্ছে বেড়ে। চাকরিটার খবর সে বেলাকে জানাতে চায়। বেলার যে বিয়েটা ঠিক হয়ে গেছে, বেলা যেন তাতে অসম্মতি জানায়। কিন্তু বেলা শুনতে পায় না। নাম্বারটা কি ভুল তবে? তাই তরুণ বলছেন,

হেলো এটা কি টু ফোর ফোর ওয়ান ওয়ান থ্রি নাইন? বেলা বোস তুমি পারছো কি শুনতে?

১০/১২ বার রং নাম্বার পেরিয়ে তোমাকে পেয়েছি দেবো না কিছুতেই আর হারাতে…

বেলা বোসেরা শুনতে পায় না…
কিন্তু বেলা বোসকে খুঁজেই পাওয়া হলো না আর। মজার ব্যাপার গানের মতোই এই নাম্বারটিও তুমুল জনপ্রিয় হয়। এই গানটি যখন রিলিজ হয় তখন কলকাতার ফোন নাম্বার ৬ ডিজিটের, কিছু সময় পরে এসে অবশ্য ফোন নাম্বার ৭ ডিজিট হয়। তখন বেলা বোসের গানের সেই নাম্বারটির অস্তিত্ব তৈরি হয় বাস্তবে। ২৪৪১১৩৯ এই নাম্বারটি ছিল হিন্দি সংবাদপত্র ‘দৈনিক বিশ্বামিত্র’র। অবশ্য কারো কারো ধারণা নাম্বারটি পত্রিকা সম্পাদকের বাড়ির নাম্বার। যাইহোক, মানুষ গণহারে এই নাম্বার ডায়াল করতে থাকলো। তখন ছিল সেই সময় যখন, টেলিফোনে মানুষ আঙ্গুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাম্বার ডায়াল করতেন। অনেক সময়ে ফোন চলে যেত রং নাম্বারে। কি যে এক অদ্ভুত সময় ছিল তখন।

যাহোক, মানুষ কেন এই নাম্বারে ফোন দেয়ার জন্যে এতো পাগলাটে হয়েছিল কে জানে। হয়ত তারা সত্যিই ভেবেছে এটা বেলা বোসের নাম্বার, হয়ত বেলাকে পেলে তারা অনুরোধ করত, প্লিজ বিয়েটা ক্যান্সেল করে দিন। কিংবা বলত, আপনি এমন পাষাণ কেন, ফোন ধরে কথা বলেন না, অবহেলা করেন একটা মানুষকে। অথবা এসবের কিছুই নয়, তারা স্রেফ বেলা বোসের অস্তিত্ব সম্পর্কে সত্য মিথ্যার যাচাই করতেই ফোন দিতেন সেই নাম্বারে…. অবস্থা এমন দাঁড়ালো, যে অঞ্জন দত্ত দুঃখপ্রকাশ জানালেন।

হাজারো মানুষ ফোন করে সম্পাদকের নাম্বারে। মানুষের কাছে তো ২৪৪১১৩৯ বেলা বোসের নাম্বার। অঞ্জন জানিয়েছেন এরকম নাম্বার আসলে কারো আছে কিনা এই ভেবে তিনি বাছাই করেননি। মূলত গানেত ছন্দ মেলাতে অনেকগুলো নাম্বার নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন তিনি, শেষে এই নাম্বারটা ঠিক করেন। একসময় মানুষের এই পাগলামি বন্ধ হলো, কলকাতায় চলে এলো ৮ ডিজিটের নাম্বার। নাম্বার নাহয় বেলা বোসের নয়, কিন্তু গানের বেলা বোস কে ছিলেন? তার কি বাস্তব অস্তিত্ব আছে? অঞ্জন দত্ত বলছেন, হ্যা তার গানের চরিত্রের বাস্তব অস্তিত্ব আছে।

দার্জিলিংয়ের ছেলে অঞ্জন কলকাতায় যখন এলেন, তখন এ এক নতুন জগত তার কাছে। কলকাতার প্রান্তিক জীবনকে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। চুটিয়ে প্রেম করেছেন, মেয়ে বন্ধু হয়েছে অনেক। জীবনটাকে নানান আঙ্গিকে তিনি দেখেছেন খুব কাছ থেকে। মধ্যবিত্ত মানসিক দ্বন্দ্ব কিংবা স্বপ্ন, হেরেও হারটাকে না স্বীকার করা – এসব ব্যাপার উঠে এসেছে তার গানেও। এই যে ছেলেটা জানে, বেলা বোসের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, তার চান্স নেই, সে হেরে গেছে। তবুও কোথাও একটা মধ্যবিত্তসুলভ আশা, স্বপ্ন তার। যদি ঠিক হয় যায় সব, তাই এতো আকুতি। এসব অঞ্জনের চেনা কলকাতার ছবি। তিনি এই প্রত্যেকটা মানুষকে চেনেন। হয়ত তাদের নাম ওমন ছিল না। বেলা বোস যাকে ভেবে লিখেছেন তার নাম হয়ত অন্য কিছুই ছিল।

দার্জিলিংয়ের সন্তান অঞ্জন দত্ত
অঞ্জন কলকাতার প্রান্তিক জীবনে পড়ে থাকা এসব মানুষের গল্পই গানে এনেছেন। এই গল্পের ব্যাপারটা তার অনেক গানেই আমরা পাই। হরিপদ চরিত্র, রঞ্জনা কিংবা বেলা বোস- প্রতিটি যেন আলাদা এক গল্প। এর পেছনে কারন হলো, অঞ্জনের প্রথম ভালবাসা সিনেমা। তিনি গানের লাইনে আসার আগে সিনেমায় পার্ট করেছেন, থিয়েটার করেছেন। তাই গল্পের ব্যাপারটা তার গানেও এসে গেছে। এসেছে ‘বেলা বোস’ গানেও। শহর কলকাতায় মধ্যবিত্ত প্রেমের চিরচেনা চরিত্র বেলা কিংবা বেকার তরুণ। অঞ্জন তাদের দেখেছেন, সেই গল্পটাই গানে গানে তুলে এনেছেন।

বাস্তবে বেলা বোস তাই আলাদা চরিত্র না হলেও তাকে চিনতে আমাদের অসুবিধে হয় না। অকল্পনীয় মিথ মনে হয় না। বেলা বোসকে বাস্তব জীবনে আমাদের সেই কাছের মানুষটার মতো মনে হয়, যাকে জীবন থেকে হারিয়ে ফেললেও কখনো এড়িয়ে যাওয়া যায় না….

Comments

comments

ফেব্রুয়ারি ২০২০
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« জানুয়ারি    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯

২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। নবধারা নিউজ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Development by: webnewsdesign.com