আইএস জিহাদির শিশু নিয়ে বিপাকে নারীরা

বৃহস্পতিবার, ০১ আগস্ট ২০১৯ | ১১:০০ অপরাহ্ণ | 11 বার

আইএস জিহাদির শিশু নিয়ে বিপাকে নারীরা

“অ্যাডামের ছিল সোনালী চুল ও সবুজ চোখ। দেখতে সে তার অন্য ভাই বোনদের চেয়ে আলাদা ছিল। তার প্রথম কান্নার আওয়াজ শোনার পর থেকেই আমি তাকে ভালবেসে ফেলি,” বলেন তার মা জোভান।

কিন্তু অ্যাডামের পিতা আইএস জিহাদি আবু মুহাজিরের হাতেই বন্দী ছিল তার মা ইয়াজিদি নারী জোভান। তাদের ঘরে জন্ম হয় অ্যাডামের।

যুদ্ধে আবু মুজাহির মারা গেলে জোভান তার নবজাতককে নিয়ে ফিরতে চাইলেন নিজের সংসারে। কিন্তু পারলেন না। পরিবার ও সমাজের চাপে অ্যাডামকে হারালেন জোভান। হারালেন তার আগের সংসারও।

আগের জীবন
জোভান তার স্বামী খেদরের সাথে একটি গ্রামে বসবাস করতেন। এই গ্রামেই তিনি বড় হয়েছেন। তার স্বামী ও সংসার নিয়ে তিনি খুব সুখেই ছিলেন।

কিন্তু পাঁচ বছর আগে হঠাৎ করেই তার জীবন আমূল বদলে যায়। সময়টা ছিল ২০১৪ সালের অগাস্ট মাস। কালো পতাকা উড়িয়ে দুটো গাড়ি সেদিন তাদের গ্রামে এসে পৌঁছালো।

জোভান ও খেদর বুঝতে পারছিলো না গ্রামে কী হচ্ছে কিন্তু ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিল যে তাদের সামনে বিপদ অপেক্ষা করছে। গাড়িতে করে যে লোকগুলো এসেছিল তারা ইসলামিক স্টেটের জিহাদি।

এই গ্রুপের কোন কোন মুখ তাদের পরিচিত ছিল। তাদের কেউ কেউ পাশের গ্রামের ছেলে যাদেরকে তার স্বামী খেদর চিনতেন।

তারা তখন তাদের জোর করে একটি গাড়িতে তুলে সিঞ্জার উপত্যকায় নিয়ে যায়। তাদের সাথে ছিল আরো ২০টির মতো পরিবার।

পরে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় ইরাকের রাজধানী বাগদাদের কাছের একটি শহরে। এর পাঁচ মাস পর আই এস জঙ্গিরা তাদেরকে নিয়ে যায় জোভান ও খেদরের গ্রামের কাছে মসুল শহরে।

সেসময় ওই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ পাহাড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তখন আই এসের ওই গ্রুপের নেতা খেদরকে বলেন তাদেরকে বুঝিয়ে গ্রামে ফিরিয়ে আনতে।

“আমরা সবাইকে বলেছিলাম যে তাদের কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু কেউ একথা বিশ্বাস করেনি,” বলেন খেদর। গ্রামবাসীরা জানতো আই এস যোদ্ধারা যেসব পুরুষকে তুলে নিয়ে যেত তারা যদি কোন কাজের না হয় তাহলে তাদের মেরে ফেলা হয়।

খেদর ও তার স্ত্রী জোভানের মতো ইয়াজিদিদের সামনে আর কোন বিকল্প ছিল না। যারা মাউন্ট সিঞ্জারে পালিয়ে গিয়েছিল তারা সেখানে আটকা পড়ে গেল। তাদের ছিল না খাবার পানি। ছিল প্রচণ্ড গরম। ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শত শত মানুষ মারাও গিয়েছিল।

অপহরণ
কিন্তু যারা পাহাড়ে যায় নি তাদেরকে ধরে নিয়ে গেল আই এস। সেসব পরিবারের সদস্যরা ছিটকে পড়লো এদিকে সেদিকে। ছেলেদের পাঠিয়ে দেওয়া হলো জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। আর নারীদের নিয়ে যাওয়া হলো যৌন-দাসী হিসেবে। আর যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে রাজি হলো না তাদের হত্যা করা হলো।

আই এস ঠিক কতজন ইয়াজিদিকে অপহরণ করেছে তার কোন হিসেব নেই কারো কাছে। তবে জাতিসংঘের এক হিসেবে বলা হচ্ছে, সেসময় সিঞ্জারে চার লাখ ইয়াজিদি বসবাস করতো। তাদের মধ্যে কয়েক হাজারকে হত্যা করা হয় এবং সাড়ে ছয় হাজারের মতো ইয়াজিদিকে দাস বানিয়ে তাদের ধর্ষণ করা হয়, নির্যাতন চালানো হয় এবং তাদের অনেককে বিক্রি করে দেওয়া হায়।

জোভানের সাথে ছিল তার তিনটি সন্তান। তাদের একটি লরির পেছনে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় আইএস খেলাফতের তথাকথিত রাজধানী সিরিয়ার রাকা শহরে। পরের চার বছর জোভানের সাথে তার স্বামী খেদরের আর দেখা হয়নি।

জোভান ও তার সন্তানদের রাখা হয় একটি তিনতলা বাড়িতে। সেখানে ছিল আরো দেড় হাজারের মতো নারী ও শিশু। তাদের অনেকেই জোভানের পরিচিত ছিল।

নতুন জীবন
এক পর্যায়ে জোভানকে বলা হলো কোন আই এস যোদ্ধার কাছে তাকে তুলে দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত তাকে দেওয়া হলো আবু মুহাজির আল তিউনিসি নামের এক যোদ্ধাকে যে তিউনিসিয়ার নাগরিক ছিল। সে ছিল শীর্ষস্থানীয় একজন কমান্ডার।

জোভানকে তখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাকে বিয়ে করতে বলা হয়। এরপর জোভান সারা দিন ধরে শুধু কাঁদতো। তিন তিনবার পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে সে ব্যর্থ হয়। প্রত্যেকবারই সে আবু মুহাজিরের হাতে ধরা পড়ে।

“একসময় আমার আত্মহত্যা করার কথাও মনে হয়েছিল। কিন্তু সন্তানদের কথা ভেবে সেটা করতে পারিনি।” জোভান বুঝতে পারলেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা ছাড়া তার আর উপায় নেই।

আই এসের যে জঙ্গির হাতে জোভান বন্দী ছিলেন তার সম্পর্কে তিনি খুব বেশি বলতে পারেন নি। তবে তিনি বলেছেন যে আই এসের সেই যোদ্ধা তাদের সবাইকে দেখভাল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

অথচ বেশিরভাগ পরিবারেই বাচ্চাদেরকে তাদের মায়েদের কাছ থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল। ছেলেদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আর মেয়েদেরকে ব্যবহার করা হতো যৌন কাজে ও বাড়ির কাজের লোক হিসেবে।

আবু মুহাজির তখন জোভান ও তার সন্তানদের নিয়ে রাকার একটি বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। ওই বাড়িটি ফাঁকা পড়েছিল। জোভান জানান, আবু মুহাজির যখন রণক্ষেত্রে না গিয়ে বাড়িতে থাকতেন তখন তিনি তার বাচ্চাদের দেখাশোনা করতেন। কখনো কখনো তাদেরকে কাছে একটি পার্কে নিয়ে যেতেন খেলতে।

অ্যাডামের জন্ম
এর মধ্যেই গর্ভবতী হয়ে পড়লেন জোভান। “কোন ওষুধ ছিল না। আমি জানতাম না যে আমি কী করবো,” বলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বাহিনী সেখানে প্রতিদিন বোমা ফেলতো। ইরাকি ও কুর্দি যোদ্ধারা যুদ্ধ করতো সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন এলাকায়। ঠিক তখনই আবু মুহাজির জোভানকে অন্য কোন আইএস যোদ্ধার কাছে বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যখন দেখলো যে জোভানের পেটে তার সন্তান বড় হচ্ছে তখন সে তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে।

গর্ভধারণের সাত মাসের মাথায় জোভান খবর পেলেন যে আবু মুহাজির এক যুদ্ধে মারা গেছে। অ্যাডামের যখন জন্ম হয় তখন রাকায় প্রতিদিন বোমা পড়তো। জোভানের বড় দুই সন্তান হাওয়া ও হাইথাম তার নতুন সন্তানের জন্ম দেওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করেছিল।

“বাচ্চারা অ্যাডামকে খুব ভালবাসতো। তারা তার যত্ন নিতো। বিশেষ করে হাওয়া। সে শুধু আমার কন্যাই ছিল না, ছিল বন্ধুও। অ্যাডামকে সে-ই খাওয়াতো, ঘুম পাড়াতো।”

ঘন ঘন বোমা পড়ার কারণে জোভান তার সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে বেড়াত এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে। সবসময় বিদ্যুতও থাকতো না। খাবার জোগাড় করাও ছিল খুব কঠিন। বাচ্চাদের যাতে খাবারের অভাব না হয় সেজন্যে খুব কম খেতেন জোভান।

“অ্যাডাম ছিল চুম্বকের মতো। আমি জানতাম সে আমার আসল স্বামীর সন্তান ছিল না। ওর বাবা ছিল একজন খুনি। কিন্তু অ্যাডাম তো আমার শরীরেরই অংশ। তার দেহে বইছে আমারই রক্ত।”

পলায়ন
ইরাকে খেদর তার পরিবার ও বাচ্চাদের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। জানতেন না নতুন এই বাচ্চাটির কথাও। এর মধ্যে ১৪ মাস পার হয়ে গেছে। এবং খেদর প্রতিদিনই তাদের হন্যে হয়ে খুঁজেছেন।

এক পর্যায়ে তিনি তার পরিবারের খোঁজ পেলেন। আই এসের কাছ থেকে পাচারকারী যে দলটি ইয়াজিদি নারী ও পুরুষদের কিনে নিচ্ছিল তাদের কাছ থেকেই জোভানের খোঁজ পেলেন তিনি। কিন্তু একেকটি বাচ্চার জন্যে তাকে ছ’হাজার ডলার করে পরিশোধ করতে হতো।

হাইতাম, হাওয়া এবং আজাদ তাদের পিতার সাথে একত্রিত হলেন। কিন্তু জোভানকে আরো দু’বছর রাকায় থেকে যেতে হয়। তার নতুন সন্তান অ্যাডামকে খেদর গ্রহণ করবেন কিনা সেবিষয়ে তিনি খুব একটা নিশ্চিত ছিলেন না।

খেদরও কয়েক মাস ধরে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। কারণ এসব বিষয়ে ইয়াজিদি সম্প্রদায় খুবই কঠোর নিয়ম অনুসরণ করে থাকে।

এসব নিয়মের একটি হলো কেউ যদি একবার ধর্ম ত্যাগ করে সে আর ফিরতে পারে না। কিন্তু আই এসের হাতে অপহৃত নারীদের ফিরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ইয়াজিদি স্পিরিচুয়াল কাউন্সিল এসব নিয়ম-নীতি কিছুটা শিথিল করে। তবে আই এস জঙ্গিদের কারণে ইয়াজিদি কোন নারী, সন্তানের জন্ম দিলে তার কী হবে সেটা পরিষ্কার ছিল না।

ইয়াজিদি ধর্মে শুধু জন্ম গ্রহণের মাধ্যমেই এই ধর্মের অনুসারী হওয়া যায়। কেউ এই ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে পারে না। ফলে, কোন সন্তানের পিতা ও মাতা- দুজনেই যদি ইয়াজিদি হন, তবেই শুধু তাকে ইয়াজিদি হিসেবে গ্রহণ করা হবে।

জোভান তখন এমন ইয়াজিদি নারীদের সাথে বসবাস করতেন যাদের আইএস যোদ্ধারা একসময় বন্দী করে রেখেছিল এবং ওই জিহাদিরা যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছে। তাদের সবাই সামাজিক কারণে সিঞ্জার গ্রামে ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন। কারণ তাদের কারো কারো গর্ভের দু’তিনজন শিশুরও জন্ম হয়েছিল।

খেদর শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন যে বাচ্চাদের তাদের মাকে প্রয়োজন। তখনই তিনি জোভান ও অ্যাডামকে নিতে রাজি হয়ে গেলেন।

গ্রামে ফেরা
চার বছর পর জোভান সিঞ্জার গ্রামে ফিরে গেলেন। সাথে ছিল গ্রামের নতুন অতিথি অ্যাডামও। কিন্তু কয়েকদিন পরেই পরিবারের চেহারা বদলে গেল। তারা বলতে লাগলো অ্যাডামকে ফেলে দিতে।

“তারা আমাকে ধর্মের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাতে শুরু করলো। তারা বলতে লাগলো আই এস যোদ্ধার ঘরে জন্ম নেওয়া মুসলিম কোন বাচ্চাকে সমাজ কখনোই গ্রহণ করবে না,” বলেন জোভান।

খেদর তখন জোভানকে নিয়ে গেলেন মসুলের একটি এতিমখানার ম্যানেজার সাকিনে মোহাম্মদ আলী ইউনুসের কাছে। তিনি ভেবেছিলেন ওই ম্যানেজার হয়তো তার স্ত্রীকে রাজি করাতে পারবেন বাচ্চাটিকে এতিমখানায় রেখে আসার ব্যাপারে। কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা চালানোর পরেও রাজি হচ্ছিলেন না জোভান। খেদর তখন কাঁদতে শুরু করেন।

সূত্র: দশ দিগন্ত

Comments

comments

আগষ্ট ২০১৯
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« জুলাই    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১

২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। নবধারা নিউজ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Development by: webnewsdesign.com