আমরা কতটুকু শিক্ষিত হতে পেরেছি?

বুধবার, ২৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩:১৯ পূর্বাহ্ণ | 8 বার

আমরা কতটুকু শিক্ষিত হতে পেরেছি?

আমরা তখন ক্লাশ টুতে পড়ি। বর্ষার আগমণের বেশি দিন বাকি নেই। গ্রামের বিস্তৃত ফসলী মাঠজুড়ে বড় বড় পাট, ধঞ্চের গাছ। দূরের রাস্তা থেকে মাঠের ভেতরের দৃশ্য দেখা ভার। তখন সহপাঠী ও ওপরের ক্লাশের শিক্ষার্থীদের কাছে শুনলাম- ‘অমুক এলাকায় একটা নতুন ব্রিজ হবে। কিন্তু ব্রিজটা জোড়া লাগছে না। সেই ব্রিজটা নাকি স্বপ্নে এলাকার মানুষকে বলেছে- আমাকে রক্ত দাও, মানুষের কল্লা (মাথা) দাও, নইলে আমি জোড়া লাগবো না।’ আরো শুনলাম- সেই রক্ত পাওয়ার জন্য নাকি শিশুদের ধরে নিয়ে বলি (জবাই)

দেয়া হচ্ছে। সেই রক্ত আর মাথা দিয়ে ব্রিজ জোড়া লাগানো হয়। এমন রোমহর্ষক কথা শুনে নিজেদের বাঁচানোর উপায় বের করতে আমি একদিন এক সহপাঠীকে বললাম, ‘আচ্ছা ব্রিজের জন্য রক্ত লাগে ভালো কথা, তো কুকুর-বিড়াল, হাঁস-মুরগি যে কোনো একটার রক্ত দিলেই তো হয়।’ তখন সহপাঠীরা পান্ডিত্যের সুরে বলতো- ‘না না! মানুষের রক্ত ছাড়া ব্রিজ জোড়া লাগে না।’

আমরা ভাবনায় পড়ে যেতাম। অনেক চেষ্টা করে বুদ্ধি বের করে বলতাম- ‘তাহলে মৃতপ্রায় বয়স্ক মানুষদের মেরে রক্ত দিলেই তো হয়’। তখন সহপাঠীদের কাছ থেকেই বুদ্ধিদীপ্ত জবাব পেতাম- ‘আরে না, কেউ কি মরার আগে মরতে চায়! তাছাড়া বড়দের ধরে নেওয়া বা চুরি করা কি এত সহজ? শিশুদের চুরি করা সহজ বলেই পোলাচারেরা (ছেলেধরা) শিশুদের টার্গেট করে।

বিশেষ করে যেই শিশু স্কুলে একা একা আসা-যাওয়া করে তাদেরকে ধরে নিয়ে বিক্রি করা হয়। সেই শিশুর কল্লা আর রক্ত দিলে ব্রিজ জোড়া লাগে।’ এই ভয়ে পুরো প্রাইমারী স্কুল জীবনে একা একা চলাফেরা করতে ভয় পেতাম আমরা। পরে জেনেছি এমন গুজব আর আতঙ্ক তখন যেমন পুরো গ্রামীণ সমাজে বিদ্যমান ছিল তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিভাবকরা শিশুধর্ষণসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও অপ্রীতিকর ঘটনা থেকে শিশুদের রক্ষায় সচেতন করার লক্ষ্যে কথিত ছেলেধরার ভয় দেখাতেন। তাদের একা একা চলতে নিরুৎসাহিত করতেন।

শিক্ষার হার বৃদ্ধি মানেই যে নৈতিকতা ও মানসিকতার উন্নয়ন নয়- এসব গুজব সেটা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। নৈতিকতা ও মানসিকতার উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে সরকারকেই। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সহপাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে গুজব থেকে রেহাই পাওয়ার উপায়। নৈতিকতার শিক্ষা জোরালো করাও সমানভাবে জরুরি। নইলে এমন গুজব দেশে যে কোনো সময়, যে কোনো ঐতিহাসিক অঘটনের জন্ম দিতে পারে। লবণের গুজব দ্রুততম সময়ে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও গুজবের এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যা একবার রটে গেলে ঘটে যেতে পারে যে কোনো কিছু।

সেই সময়ের কথা বলছিলাম যখন যাতায়াত আর যোগাযোগ ছিল বেশ কষ্টকর, ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। গ্রাম আর শহরের মধ্যেই ছিল যোজন যোজন দূরত্ব। কালের বিবর্তনে মাত্র তিন দশকের ব্যবধানে সেই গ্রামে আজ অভ‚তপূর্ব পরিবর্তন, পরিবর্তের এই মাত্রা আগের তিন শত বছরের চেয়েও অনেক বেশি। আমাদের সেই গ্রামে এখন প্রায় সব বাড়িতে যাওয়ার পাকা রাস্তা আছে। যখন-তখন যেখানে খুশি আসা-যাওয়া করা যায়। মাত্র ৩ ঘন্টায় ঢাকা যাওয়া/আসা যায়। অথচ আগে গ্রাম থেকে ঢাকা যেতে পুরো দিন লেগে যেত। আর এখন সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকেলেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছানো যায়।

প্রতি ঘরে এক/একাধিক মোবাইল ফোন। যখন-তখন বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের মানুষের সাথে স্বল্প খরচায় মোবাইলে কথা বলা যায়, প্রায় বিনা খরচায় ভিডিওতে একে অপরকে দেখা যায়। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ। এর কল্যাণে ডিশলাইনসহ রঙিন বড় বড় টেলিভিশন। দেশ-বিদেশের অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেল দেখা যায়। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে ঘটে যাওয়া এই মুহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোও কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দেখা ও শোনা যায়। আর লাইভ টেলিকাস্টে তো সরাসরি বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের ঘটনা দেখা ও জানা যায়। রাতে ঢাকায় ছাপা পত্রিকা ঢাকার ঘুম থেকে দেরীতে ওঠা পাঠকের আগেই গ্রামের পাঠক পড়ে শেষ করে ফেলে। ইন্টারনেট, ফেসবুক, ই-মেইলের কল্যাণে মুহূর্তের মধ্যেই দেশ-বিদেশে চিঠি, তথ্য, ডকুমেন্ট ইত্যাদি আদান-প্রদান করা যায়।

সভ্যতার এত দ্রুততর বিকাশ একসময় ছিল পুরোদস্তুর অকল্পনীয়। তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ ও সহজলভ্যতার সুবাধে যে কোনো ঘটনা/তথ্য যাচাই করা এখন কেবল কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার মাত্র। কোথাও কোনো ঘটনা ঘটেছে শুনলে তা যাচাই করার অসংখ্য দেশি-বিদেশী টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও, অনলাইন পত্রিকা, নিউজ পোর্টাল, ওয়েবসাইটসহ কতশত মাধ্যম। আর নিজের কাছে তো সর্বদা সচল মোবাইল ফোন আছেই। বিশ্বাস ও নির্ভরযোগ্যতায় চরম ঘাটতি থাকলেও ফেসবুকও আজকাল তথ্য আদান-প্রদানে অস্বাভাবিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বেড়েছে নারী শিক্ষাসহ দেশের সার্বিক স্বাক্ষরতা/শিক্ষার হার। জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক উন্নতি।

এত এত উন্নতি, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি ও শিক্ষার হার বৃদ্ধি মধ্যেও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমরা আসলেই কতটুকু শিক্ষিত হতে পেরেছি, কতটুকু সচেতন ও নৈতিক মানুষ হতে পেরেছি। সাম্প্রতিক কথিত লবণ সংকট ও দাম বৃদ্ধির আশঙ্কার গুজব এবং কয়েক মাস আগে পদ্মা সেতুর জন্য কথিত রক্তচাহিদা হেতু ছেলেধরার গুজব এই প্রশ্নের গুরুত্ব বাড়িয়েছে শতগুণে।

আশির দশকে অবুঝ ছাত্র হিসেবে ছোট্ট ব্রিজ তৈরির কথিত রক্তের প্রয়োজনীয়তাহেতু ছেলেধরার গুজব আমাদের শিশুমনকে বিভ্রান্ত, বিচলিত ও ভীত করে তুলেছিল। তিন দশক পরেও দেখছি, আমজনতা সেই গুজব মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে গুজবের ডালপালা বিস্তারে সহযোগীর ভ‚মিকায় অবতীর্ণ। অনুসন্ধিৎসু মনে ব্যক্তি পর্যায়ের আলাপে শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে অধিকাংশের মধ্যে অজানা ভীতি ও শঙ্কা দেখে রীতিমতো নিজেই শঙ্কিত হওয়ার উপক্রম। যাতায়াত, যোগাযোগ ও জীবনযাত্রায় আকাশছোঁয়া পরিবর্তন হলেও আমাদের নৈতিকতা ও মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে কতটুকু?

অথচ এখন কোনো খবর জানার জন্য শত-সহস্র মাধ্যম অবারিত। ব্রিজ কিংবা কোনো কাঠামো বানাতে মানুষ তো দূরের কথা কোনো প্রাণীর রক্তেরই প্রয়োজন নেই- সেটা এ যুগের কোন্ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এমনকি কোন্ শিশুশিক্ষার্থী না জানেন! তারপরও এই গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে এদেশের কত নিরীহ মানুষ আমাদের কথিত সচেতন মানুষদের হাতে হতাহত হয়েছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় লিখেছেন- ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙ্গালি করে- মানুষ কর নি।’ আজ কবিগুরু বেঁচে থাকলে হয়তো লিখতেন- ‘সতের কোটি সন্তানের হে শিক্ষিত জননী রেখেছে উন্নত-সমৃদ্ধ করে- সচেতন কর নি।’

এই বঙ্গে গুজব নামক ভয়ংকর জন্তু তার সর্বশেষ হিংস্র থাবা ফেলেছে সম্প্রতি। কে বা কারা গুজব ছড়ালো- ‘সারাদেশে লবণের সংকট। খুব শীঘ্রই লবণের দাম অনেক বেড়ে যাবে।’ হুজুগে বাঙালিকে আর ঠেকায় কে! দে দৌড় দোকানে। বাসায় লবণ, তবুও আরো কিনো। ছয় মাস, একবছরের লবণ কেনা শুরু করলো কেউ কেউ। গুজবের সুবাতাস ততক্ষণে পেয়ে গেল দোকানীরাও। তাদেরও ঠেকায় কে! ২০-৩০ টাকার লবণ বিক্রি হলো ৫০-৬০-১০০ এমনকি ২০০ টাকায়ও। অতি অল্প সময়ে সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এই গুজব। গুজবের দেশব্যাপী প্রচার-প্রসারে সহায়ক শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ফেসবুক ও মোবাইল ফোন। এক সময় গুজব দূরীকরণে প্রযুক্তির ব্যহার করা হতো আর এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। হায় সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!

লবণ সংকটের গুজবে দোকানে লেগে যায় ক্রেতাদের দীর্ঘলাইন। অথচ পাবলিক বাসে-ট্রেনে উঠতে এসব মানুষের লাইনে দাঁড়ানোয় আপত্তির শেষ নেই। শহর-গ্রাম, অশিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে আচ্ছন্ন করে এই ভয়ানক গুজব। অথচ এটি সত্যি না মিথ্যা তা মুহূর্তের মধ্যেই যাচাই করার সুযোগ আছে এখন। নির্বোধ অনেক মানুষের ভাবটা ছিল এমন যে, আর কাউকে জানিয়ে নিজে কেনা ও পারিবারিক মজুদ করা থেকে যেন বঞ্চিত না হয়। বাস্তবে ঠকেছে এসব লোভীরাই।

দিনভর টেলিভিশন, অনলাইন, পত্রিকা এমনকি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হলো- দেশে লবণের কোনো সংকট নেই, দামও বাড়েনি। এমনকি বড় বড় লবণ কোম্পানিগুলো টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন এবং জেলায় জেলায় মাইকিং করে জানিয়েছে লবণের সংকট নেই, দামও বাড়েনি। বরং দেশের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়াগুলো জানালো, এবার চাহিদার চেয়ে দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছে অনেক বেশি।

আশার কথা হচ্ছে, লবণের এই গুজব একদিনেই ঠেকাতে সমর্থ হয়েছে সরকার। এর পেছনে মিডিয়ার প্রচার ও সরকারের কঠোর অবস্থান বেশ কাজে দিয়েছে। পেঁয়াজের সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এই গুজবে বিশ্বাস স্থাপনে অনেক সহায়ক হয়েছিল। এখন সময় এসেছে, এসব গুজবের উৎস ও প্রচারণার মাধ্যমগুলো চিহ্নিত করা এবং এগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রণহীন ও অবাধ যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারে অনেকেই এখন স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

বিদেশী এসব যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করতে দেশব্যাপী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। জনগণকে জানান দিতে হবে- স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়, নয় স্বৈরাচারিতা। উন্নত দেশ গঠনে সবার আগে প্রয়োজন উন্নত জাতি গঠন। সে জন্য দরকার আমাদের নৈতিকতা ও মানসিকতার ব্যাপক উন্নয়ন।

শিক্ষার হার বৃদ্ধি মানেই যে নৈতিকতা ও মানসিকতার উন্নয়ন নয়- এসব গুজব সেটা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। নৈতিকতা ও মানসিকতার উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে সরকারকেই। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সহপাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে গুজব থেকে রেহাই পাওয়ার উপায়। নৈতিকতার শিক্ষা জোরালো করাও সমানভাবে জরুরি। নইলে এমন গুজব দেশে যে কোনো সময়, যে কোনো ঐতিহাসিক অঘটনের জন্ম দিতে পারে। লবণের গুজব দ্রুততম সময়ে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও গুজবের এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যা একবার রটে গেলে ঘটে যেতে পারে যে কোনো কিছু।

লেখক : সাংবাদিক

Comments

comments

ডিসেম্বর ২০১৯
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« নভেম্বর    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  

২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। নবধারা নিউজ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Development by: webnewsdesign.com