টাইটানিক ডুবেছে, ডোবেনি ভালোবাসা!

শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ২:২০ অপরাহ্ণ | 61 বার

টাইটানিক ডুবেছে, ডোবেনি ভালোবাসা!

প্রিয় টাইটানিক, ভালোবাসার অতল স্রোতে ভেসে যাও, দূর হতে দূরান্তর, যুগ হতে যুগান্তর! আমরা যারা ৯০ এর দশকে দুরন্ত শৈশব কাটিয়ে বড় হবার দিকে ধীরে ধীরে পা বাড়াচ্ছিলাম, শতাব্দীর শেষ দিকে সেই অদ্ভুত ঘোর লাগা সময়ে মুক্তি পেয়েছিলো ইতিহাসের জ্বলজ্বলে ট্র্যাজেডি হিসেবে সাক্ষী হয়ে থাকা চলচ্চিত্র “টাইটানিক!” হ্যাঁ প্রিয় পাঠক, শিরোনাম দেখে ঠিকই ধরেছেন।

আজ আমরা কথা বলবো ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি চলচ্চিত্র টাইটানিক এর জানা-অজানা কোন অধ্যায় নিয়ে। ১৯৯৭ সালে আমেরিকা জুড়ে মুক্তি পেয়েছিলো আমাদের সবার প্রিয় চলচ্চিত্র “টাইটানিক!” হলিউডের অন্যতম সেরা পরিচালক হিসেবে পরিচিত জেমস ক্যামেরনের হাত ধরে উঠে এসেছিলো ১৯১২ সালে ডুবে যাওয়া জাহাজ টাইটানিকের অনবদ্য উপাখ্যান।

মহাকালের জয়রথে হয়ত আরও আরও ইতিহাস রচিত হবে চলচ্চিত্রের হাত ধরে। তবে আমাদের মনে টাইটানিক যতটা নিবিড় ও সংগোপনে দাগ কেটে গেঁথে রয়েছে “দ্য হার্ট অব দ্য ওশান” হয়ে, পরবর্তী কোনো ইতিহাসে কী সেটা মুছে যাওয়ার দাবীদার? নিঃসন্দেহে না! যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তির হিসেবে টাইটানিকের বয়স এখন ২৩ বছর চলছে! গত দুই যুগে টাইটানিক গড়েছে অসংখ্য রেকর্ড! ২০০ মিলিয়ন বাজেটের টাইটানিক ওয়ার্ল্ড ওয়াইড আয় করেছে ২.১৮৭ বিলিয়ন ইউ এস ডলার!

টাইটানিক’ই পৃথিবীর প্রথম সিনেমা, যা বিলিয়ন ডলার আয়ের রেকর্ড গড়ে! মাথা চুলকাতে চুলকাতে টাকার হিসেব করতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম, আসলেই এতো টাকা? ১৮০৮৯৪৪২৪৫০০/-! মুক্তির পর থেকেই টাইটানিক বক্স অফিস এবং সমালোচকদের মুখ, দুটোই সমান তালে জয় করতে থাকে। পৃথিবীর সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কার মঞ্চ একাডেমী এওয়ার্ডে (অস্কার) ১৪ টি নমিনেশন পাওয়ার সাথে সাথে সবচেয়ে বেশী, ১১টি একাডেমী এওয়ার্ড ঝুলিতে ভরেছে টাইটানিক! ২০১০ সালে অ্যাভাটার মুক্তির আগ পর্যন্ত টাইটানিক’ই ছিলো হায়েস্ট গ্রসিং ফিল্ম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড!

অদ্যাবধি টাইটানিকের জয়রথ চলছেই। সেই জয়রথের ধারাবাহিকতার রেশ ধরেই টাইটানিকের ২০ তম এনিভার্সারীতে আবারও মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো টাইটানিক কতৃপক্ষ। আমেরিকার ন্যাশনাল ফিল্ম রেজিস্ট্রি কতৃক টাইটাইনিক সিলেক্টেড হয়েছে তাদের সংরক্ষিত ফিল্মের তালিকায়! নিঃসন্দেহে দারুন এক অর্জন!

সেই ছোট্ট বেলায় যখন মা খালাদের কিবা বড় ভাই, মামাদের সাথে ডিভিডি প্লেয়ার আর ক্যাসেট ভড়া করে টাইটানিক দেখেছি, ক’জনই বা এত কিছু ভেবেছি! ভাবার সময়ই দেয়নি প্রিয় জ্যাক আর রোজ জুটি! প্রেমের সম্পাদ্য কিবা উপপাদ্যে মাতিয়ে রেখেছিলো পুরোটা সময়জুড়ে। তাই আজও যখন টাইটানিক দেখতে বসি, মনের অজান্তেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি!

এখনো চোখে ভেসে আছে টাইটানিকের সেই দৃশ্যগুলো এবার কিছু মজার এবং অদ্ভুত ট্রিভিয়া জানা যেতে পারে টাইটাইনিক সিনেমা সম্পর্কে:

১. লিওনার্দো ডি’ক্যাপ্রিওর বিখ্যাত সংলাপ “I’m the king of the world” টাইটানিকের চিত্রনাট্যে ছিলই না! কী অদ্ভুত কথা! ক্যামেরনের সিনেমায় গালগল্প? হ্যাঁ, তাই হয়েছে! ডি’ক্যাপ্রিও নিজেই এই সংলাপ বলেছেন শট নেয়ার সময়! আর তাতেই বাজিমাত! আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের তালিকায় সর্বকালের সেরা ১০০ মুভি কোট (উক্তি)‘এ স্থান করে নেয় এই সংলাপ!

২. কেট উইন্সলেটের সেই বিখ্যাত ন্যুড ছবি আঁকার শুটের জন্য তাকে ডি’ক্যাপ্রিওর সামনে যেতে হবে, কিন্তু কীভাবে বরফ গলাবেন, সেটা বুঝতে পারছিলেন না!

শুটিং এর প্রথম দিন ডি’ক্যাপ্রিও কেটের ড্রেসিং রুমে হঠাৎ প্রবেশ করেন, কেটের প্রস্তুতি দেখার জন্য, যেখানে তার নিজেকেই ওই ছবি আঁকার রোল প্লে করতে হবে! কেট বলেন, “আমি মেকাপ নিচ্ছিলাম একদম বিবসনা হয়ে! এবং হঠাৎ দেখি লিও সেখানে! সে আমাকে দেখেই চলে গেল এবং আমি বললাম, আমরা আজ সারাদিন এভাবেই কাটাবো আর আমাদের সমস্যা সমাধান!” এভাবেই বরফ গলে গেলো!

৩. রোজের ন্যুড ছবি আঁকার সেই দৃশ্য মূঃলত সাবার আগে শুট করা হয়, আর সেই দৃশ্য চিত্রনাট্যের কারিশমায় চলে আসে মাঝে!

৪. গ্লোরিয়া স্টুয়ার্ট, যিনি ১০১ বছরের রোজের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, তিনি সত্যিকার অর্থেই টাইটানিক জাহাজ ডোবার সময়ে বেঁচে ছিলেন! টাইটানিক সিনেমা নির্মানের সময় তার বয়স ছিলো ৮৭ বছর! ৮৭ বছর বয়সের একজন মানুষকে ১০১ বছরে রুপান্তর করেছিলো টাইটানিকের মেক আপ আর্টিস্ট! ২০১০ সালে স্টুয়ার্ট ১০০ বছর বয়সে তিনি মারা যান!

৫. টাইটানিকের কস্টিউম ডিজাইনার দেবোরাহ লীন স্কট একই রকমের ২৪টি ড্রেস বানিয়েছিলেন কেটের জন্য! যাতে তাকে সবসময় সুন্দর দেখায়! হোক সেটা পানিতে কিবা অন্য কোথাও!

৬. জ্যাকের হাতে যেই স্কেচ ফাইলটি ছিলো এবং তার ভেতর যতগুলো স্কেচ ছিলো! তার সবগুলো এঁকেছেন জেমস ক্যামেরন নিজেই! এমনকি কেট উইন্সলেটের সেই ন্যুড ছবিও ক্যামেরন নিজে এঁকেছেন! আরও মজার ব্যাপার হলো, সেই ছবি পরবর্তিতে ২০১১ সালে নিলামে তোলা হয়! ১৬০০০ ইউ এস ডলারে সেটা বিক্রিও হয়ে যায়!

৭. এই ছবিতে সব পেসেঞ্জার যতটা সময় টাইটানিক জাহাজে কাটিয়েছেন, তার চেয়েও বেশী সময় কাটিয়েছেন পরিচালক নিজে!

৮. মূল সিঁড়ি ঘর পানিতে ভেসে যাওয়া একটি দৃশ্য একবারেই শট নিতে হয়েছিলো পরিচালকের! কারণ, সমস্ত সেট ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল! এই একটি শট বাস্তবিক করার জন্য ৯০০০০ গ্যালন পানি ঢালা তো চাট্টিখানি কথা না!

৯. মূল টাইটানিক জাহাজ নির্মানে তৎকালীন খরচ ছিলো ৭.৫ মিলিয়ন! যা আজকের বাজারে প্রায় ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার! আর ১৯৯৭ সালে জেমস ক্যামেরনের টাইটানিক মুভির বাজেট ছিলো ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার!

১০. টাইটানিক’ই ছিলো প্রথম সিনেমা, যা থিয়েটারে চলাকালীন সময়েই ভিডিও ফরম্যাটে মুক্তি দিতে হয়েছিলো শুধুমাত্র আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার জন্য!

১১. টাইটানিক সিনেমার মুল উপাদান যদি রোজ আর জ্যাক’কে ভাবা হয়! তাহলে আমরা সেই চরিত্রে শুধুমাত্র কেট আর লিওনার্দোকেই বুঝি! অথচ তাদের এই সিনেমায় অভিনয় করার কথাই ছিলো না!প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পছন্দ ছিলেন অন্য কেউ!

১২. টাইটানিকের শুটিং চলাকালে ডি’ক্যাপ্রিওর পোষা টিকটিকি ট্রাকের চাপায় আহত হয়। যদিও পরে তিনি নার্সদের সহায়তায় তাকে বাঁচিয়েও তোলেন!

১৩. কেট উইন্সলেট শুটিং এর সময় কোনো ওয়েট স্যুট (ডুবুরিদের জন্য আলাদা পোষাক) না পরায় নিওমোনিয়ায় আক্রান্ত হন!

১৪. মুক্তির আগ পর্যন্ত এই সিনেমার নাম ছিলো “প্লানেট আইস!” পরিচালক জেমস ক্যামেরন গোপনীয়তা বজায় রাখতেই এই ফাঁদ পাতা নামটি রেখেছিলেন! পরবর্তিতে যা নাম বদলে হয়ে গেলো “টাইটানিক!” হয়ে থাকিলো ইতিহাস!

১৫. জেমস ক্যামেরন চাননি, টাইটানিকে কোনো থিম সং কিবা কোনো গান থাকুক! মিউজিক কম্পোজার জেমস হর্নার এর কাছে চেলিনি ডিওনের প্রথম রেকর্ড করা “My heart will go on” গানের ড্যামো কপি ছিলো! পরবর্তিতে ক্যামেরন তার সিদ্ধান্ত বদল করেন এবং সিনেমাতে এই গান সংযুক্ত করেন! যদিও ডিওনের এই গান তার নিজেরই পছন্দ ছিলোনা! অথচ ওই গানই আজ ইতিহাস হয়ে কানে বাজে!

১৬. ১৫ই এপ্রিল, ২০১২ টাইটানিক জাহাজ ডোবার ১০০ তম এনিভার্সারী পালিত হওয়ার দিনে টাইটানিক সিনেমা থ্রি-ডি ফরম্যাটে আবারও মুক্তি দেয়া হয়, যেটাতে বিশ্বব্যাপী আয় করে ৩৪৩ মিলিয়ন ইউ এস ডলার!

১৭. টাইটানিকে অভিনয়ের জন্য লিন্ডসে লোহান অডিশন দেন ৮ বছর বয়সে, যখন তাকে কেউই তেমন চেনে না!। যদিও পরবর্তিতে ক্যামেরন অনুভব করেন, তার জ্বলন্ত লাল চুলের জন্য মানুষ দ্বিধায় পড়তে পারে! ভাবতে পারে, রোজ এবং রুথের সাথে তার কোনো সম্পর্ক রয়েছে! যাদেরও জ্বলন্ত লাল চুল রয়েছে! কী অদ্ভুত, না? স্যরি লিন্ডসে!

১৮. রোজ এবং জ্যাক জাহাজের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে, রোজের সংলাপ ছিলো, “I’m flying, Jack!” সেই সূর্যাস্তের দৃশ্য ছিলো প্রাকৃতিক এবং আসল। যেখানে কোনো সিজিআই ইফেক্ট ব্যবহার করা হয়নি! কারন, ক্যামেরন জানতেন, এই দৃশ্য সূর্যাস্তের সময়েই সবচেয়ে ভালো হবে!

১৯. জ্যাকের মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে রোজ যে কাঠের ওপর ভর করে পানিতে ভাসতে থাকে, সেটা প্রকৃত অর্থেই হাতে তৈরী ছিলো পরিমাপ মত, যাতে রোজের ভার বইতে পারে শুধুমাত্র! পরবর্তিতে সেই কাঠের স্থান হয় কানাডার নোভা স্কশিয়ায়, ম্যারিটাইম মিউজিয়ামে।

২০. ‘টাইটানিক’ হচ্ছে মুভি ইতিহাসের প্রথম মুভি যেখানে একটি চরিত্রে অভিনয় এর জন্য দুই জন আলাদাভাবে অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিলেন।

প্রিয় টাইটানিক, ভালোবাসার অতল স্রোতে ভেসে যাও, দূর হতে দূরান্তর, যুগ হতে যুগান্তর! এক বুক ভালোবাসা রইলো।

Comments

comments

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  

২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। নবধারা নিউজ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Development by: webnewsdesign.com