প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ছোট্ট রাসেল সোনা’

সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৭:৫৪ অপরাহ্ণ | 142 বার

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ছোট্ট রাসেল সোনা’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট ছাড় দেয়নি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট সন্তান শেখ রাসেলকে। ছোট্ট রাসেলকে মা, বাবা, ভাই, ভাবী ও চাচা সকলের লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নেওয়া হয়। তখন সে বারবারই বলেছিল, ‘মায়ের কাছে যাবো’। মায়ের কাছে নেওয়ার নাম করেই হত্যা করা হয় শিশু রাসেলকে। তার বড় বোন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার স্মৃতি লিখেছেন শেখ রাসেল বইতে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত বইতে তিনি ‘আমাদের ছোট্ট রাসেল সোনা’ শিরোনামে আনন্দ-বেদনার স্মৃতি লিপিবদ্ধ করেছেন।

মৃত্যুর আগে রাসেলকে যে মানসিক কষ্ট দেওয়া হয়েছিল, দুঃসহ সেই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন,ওই ছোট্ট বুক কি তখন কষ্টে-বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাদের সান্নিধ্যে, স্নেহ-আদরে হেসে খেলে বড় হয়েছে তাদের নিথর দেহগুলো পড়ে থাকতে দেখে, ওর মনের কী অবস্থা হয়েছিল- কী কষ্টই না ও পেয়েছিল!

. ১৯৬৪ সালে ১৮ অক্টোবর রাসেলের জন্ম হয় ধানমণ্ডি বত্রিশ নম্বর সড়কের বাসায়। রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে বাবা শেখ মুজিবুর রহমানকে খুব কম সময়ই কাছে পেয়েছে রাসেল।

একসময় বেগম ফজিলাতুন্নেসা তাকে বাবা ডাকতে শিখিয়েছিলেন। জন্মের মুহূর্ত লিখতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলছেন, ‘…রাসেলের জন্ম হয় ধানমণ্ডি বত্রিশ নম্বর সড়কের বাসায়, আমার শোবার ঘরে।দোতালার কাজ তখনও শেষ হয়নি। বলতে গেলে মা একখানা করে ঘর তৈরি করিয়েছেন। একটু একটু করেই বাড়ির কাজ চলছে। নীচতলায় আমরা থাকি। উত্তর পূর্ব দিকের ঘরটা আমার ও কামালের। সেই ঘরেই রাসেল জন্ম নিলো রাত দেড়টায়।’

রাসেলের নামকরণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘অনেক বছর পর একটা ছোট্ট বাচ্চা আমাদের বাসায় ঘর আলো করে এসেছে, আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে।আব্বা বাট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, রাসেলের বই পড়ে মাকে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। মা রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে, নিজের ছোট সন্তানের নাম রাসেল রাখেন।’

প্রিয় বড় বোনের (শেখ হাসিনা) হাত ধরে হাঁটতে শেখা, তার হাতে খাওয়ার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছিল ছোট ভাইটি। রাসেলের বেড়ে ওঠার স্মৃতি হাতড়ে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘…রাসেলের সবকিছুতেই যেন ছিল ব্যতিক্রম।

ও যে অত্যন্ত মেধাবী তার প্রমাণ অনেকভাবেই আমরা পেয়েছি। আমাকে হাসুপা বলে ডাকতো। কামাল ও জামালকে ভাই বলতো আর রেহানাকে আপু। কামাল ও জামালের নাম কখনও বলতো না। আমরা নাম বলা শেখাতে অনেক চেষ্টা করতাম। কিন্তু ও মিস্টি হেসে মাথা নেড়ে বলতো ভাই। দিনের পর দিন আমরা যখন চেষ্টা করে যাচ্ছি, একদিন ও হঠাৎ করে বলেই ফেলল, ‘কামমাল’, ‘জামমাল’।’

শিশুকালে ঘাতকের বুলেটে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন রাসেল মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে রাজনৈতিক পরিবারের জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল। তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী লিখছেন, ‘চলাফেরায় ও বেশ সাবধানী কিন্তু সাহসী ছিল, সহসা কোনও কিছুতে ভয় পেতো না।

কালো কালো বড় বড় পিপড়া দেখলে ধরতে যেত। একদিন একটা ওল্লা (বড় কালো পিপড়া) ধরে ফেলল, আর সাথে সাথে পিঁপড়াটা ওর হাতে কামড়ে দিল। ডান হাতের ছোট্ট আঙুল কেটে রক্ত বের হলো। সাথে সাথে ওষুধ দেওয়া হলো। আঙুলটা ফুলে গেছে। তারপর থেকে আর ও ওল্লা ধরতে যেত না। তবে ওই পিঁপড়ার একটা নাম নিজেই দিয়ে দিলো। কামড় খাওয়ার পর থেকেই কালো বড় পিঁপড়া দেখলে বলতো ‘ভুট্টো’।’

রাসেলের কোমলমতি মনের উদাহরণ আনতে গিয়ে আরেকটি ঘটনারও উল্লেখ করেন তার প্রিয় হাসুপা। তিনি লিখেছেন, ‘মা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। রাসেলকে কোলে নিয়ে নীচে যেতেন এবং নিজের হাতে খাবার দিতেন কবুতরদের। হাঁটতে শেখার পর থেকেই রাসেল কবুতরের পেছনে ছুটতো, নিজ হাতে ওদের খাবার দিত। আমাদের গ্রামের বাড়িতেও কবুতর ছিল। কবুতরের মাংস সবাই খেত।

বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন অধিকাংশ জায়গা পানিতে ডুবে যেত, তখন তরিতরকারি ও মাছের বেশ অভাব দেখা দিত। তখন প্রায়ই কবুতর খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। তাছাড়া কারও অসুখ হলে কবুতরের মাংসের ঝোল খাওয়ানো হতো।… রাসেলকে কবুতরের মাংস দেওয়া হলে খেত না।ওকে ওই মাংস খাওয়াতে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি। ওর মুখের কাছে নিয়ে গেছি, মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে…ওই বয়সে ও কী করে বুঝতে পারতো যে, ওকে পালিত কবুতরের মাংস দেওয়া হয়েছে!’

রাজনীতির ব্যস্ততা আর মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব ও পরবর্তী বাস্তবতার কারণে খুব বেশি সময় বাবাকে কাছে না পাওয়া রাসেল কিছু সময়ের জন্য কাছে পেলে কী ধরনের আচরণ করতো, সে বিষয়ে বলতে গিয়ে বর্ণনায় বলা হচ্ছে, ‘১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রায় তিনবছর পর আব্বা গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যখন মুক্তি পান, তখন রাসেলের বয়স চারবছর পার হয়েছে। আব্বা বাড়ির নিচতলায় অফিস করতেন। আমরা তখন দোতালায় উঠে গেছি। ও সারাদিন নিচে খেলা করত। আর কিছুক্ষণ পরপর আব্বাকে দেখতে যেতো। মনে মনে বোধহয় ভয় পেত যে, আব্বাকে বুঝি আবার হারাবে।’

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আব্বা ভাইসহ পরিবারের সবাইকে একসাথে না পেয়ে শিশু রাসেলের মনের কষ্ট লুকানো দেখে পরিবারের সকলে অবাক হতেন, উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী লিখছেন, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরের পরপরই বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হানাদারদের আক্রমণ চালানোর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়।স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী লিখছেন, ‘…আমার মা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হন।

আমাদেরকে ধানমন্ডির আঠারো নম্বর সড়কে (পুরাতন) একটা একতলা বাসায় বন্দি করে রাখে।’ প্রথমদিকে রাসেল আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করতো। ‘মনের কষ্ট কীভাবে চেপে রাখবে আর কীভাবেই বা ব্যক্ত করবে। ওর চোখের কোণে সবসময় পানি। যদি জিজ্ঞাসা করতাম, ‘কী হয়েছে রাসেল? বলত ‘চোখে ময়লা’। ওই ছোট্ট বয়সে সে চেষ্টা করতো মনের কষ্ট লুকাতে।’

রাসেলের শিক্ষাজীবনের কথা বলতে গিয়ে স্মৃতি কথায় বলা হচ্ছে, রাসেল এই ছোট বয়স থেকেই কী রকম আপ্যায়ন পরায়ন ছিল। তিনি লিখছেন, ‘…স্বাধীনতার পর এক ভদ্রমহিলাকে রাসেলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হল। রাসেলকে পড়ানো খুব সহজ কাজ ছিল না। শিক্ষককে ওর কথাই শুনতে হতো। প্রতিদিন শিক্ষয়িত্রীকে দুটো করে মিষ্টি খেতে হবে।

আর শিক্ষয়িত্রী এ মিষ্টি না খেলে ও পড়তে বসবে না। কাজেই শিক্ষিকাকে খেতেই হেতো। তাছাড়া সবসময় ওর লক্ষ্য থাকত শিক্ষিকার যেন কোনও অসুবিধা না হয়। মানুষকে আপ্যায়ন করতে রাসেল খুবই পছন্দ করতো।’

প্রধানমন্ত্রী ভাই হারানোর যন্ত্রনা থেকে লিখেছেন, হয়তো তার সাথে জার্মানী নিয়ে যেতে পারলে ছোট ভাইটি বেঁচে যেত ঘাতকের বুলেটের হাত থেকে। তিনি বলছেন, ‘৩০ জুলাই (১৯৭৫) আমি জার্মানিতে স্বামীর কর্মস্থলে চলে যাই। রাসেল খুব মন খারাপ করেছিল। কারণ জয়ের সাথে একসাথে খেলতো।আমি জার্মানি যাবার সময় রেহানাকে আমার সাথে নিয়ে যাই।

রাসেলকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ওর হঠাৎ জন্ডিস হয়, শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। সে কারণে মা ওকে আর আমাদের সাথে যেতে দেননি। রাসেলকে যদি সেদিন আমাদের সাথে নিয়ে যেতে পারতাম, তাহলে ওকে চিরতরে হারাতে হতো না।’

Comments

comments

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  

২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। নবধারা নিউজ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Development by: webnewsdesign.com