বাঙালি তোমরা বেঁচে থাকো মানুষ নয় পশু হয়ে

মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯ | ১১:০০ অপরাহ্ণ | 98 বার

বাঙালি তোমরা বেঁচে থাকো মানুষ নয় পশু হয়ে

তাসলিমা বেগম রেনু। বয়স ৪০ হবে। খুবই পরিপাটি ছিলেন তিনি। সুন্দর করে শাড়ি পরতেন, গুছিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। মাস্টার্স করার পর বিয়ে হয় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। প্রথম কিছুদিন বেশ ভালোই চলছিল তাদের সংসার। এক বছরের মাথায় কোলজুড়ে আসে এক ছেলে।

ছেলে পেটে থাকা অবস্থায় স্বামীর আর তর সইলো না। জড়িয়ে গেলেন পরকীয়ায়। বিষয়টি প্রথমে গোপনই ছিল। কিছুদিন পর রেনু বুঝতে পারে তার স্বামী আর তার নাই। তার প্রতি আর আগের আকর্ষণ নাই। তার দুঃখের জীবন তখনই শুরু। ওই সময় স্বামী খুব বাজে ব্যবহার শুরু করে। এর মাঝেই আবার সন্তান সম্ভবা হয়ে যান রেনু। স্বামী ততদিনে পুরোপুরি অন্যদিকে চলে গেছে।

এবার একটা ফুটফুটে মেয়েও আসলো। মেয়ে জন্মানোর কিছুদিনের মধ্যেই সংসারে অশান্তি চরমে। রেনুকে বাধ্য হয়ে ডিভোর্সের পথে হাঁটতে হলো। সেই থেকে তার একলা জীবন শুরু। কতবার ভেবেছেন আত্মহত্যা করবে। পারেনি। মরার কথা মনে হলেই সামনে ভেসে উঠে ছেলে-মেয়ের মুখ। আহা এই ছেলে-মেয়েগুলোর যে আল্লাহ আর মা ছাড়া কেউ নেই।

বাবার বাসায় ভাইয়ের সংসারে কষ্ট করে মানিয়ে চলছে সে। ছোটখাটো একটা চাকরি যোগাড় করেছে। দেখতে দেখতে ছেলে কেজিতে পড়ছে। আর মেয়ের বয়স চারবছর পূর্ণ হলো জুন মাসে। হঠাৎ একদিন মনে হলো মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করে দিলে কেমন হয়? বছরের মাঝামাঝি সময় কোথায় ভর্তি করানো যায় ভাবছিলেন।

বাড্ডার একটা প্রাইমারি স্কুলে ভর্তির সুযোগ হতে পারে ভেবে সে এক দুপুরে ওই স্কুলের গেটে দাঁড়ায়। ভেতরে ঢুকতে চাইলে আয়া ঢুকতে দেয়নি। তখন ভাবে ছুটি হলেই সে ভেতরে ঢুকবে। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকলো একা-একা। এক ভদ্রলোক তাকে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন আপনি কে? তখন সে তার নাম বললো ‘আমি রেনু।’

আবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন এখানে কেনো আসছেন? আপনি কি করেন? আপনার বাসা কোথায়? তার প্রশ্ন করার সময় আরও বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়ে গেল। এত মানুষ দেখে রেনু ভয় পেয়ে গেল। সহজ প্রশ্নগুলোর ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারলেন না। অবশ্য ডিভোর্স হওয়ার পর থেকেই কিছুটা মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন রেনু। কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল তার সমস্ত স্বতঃস্ফূর্ততা।

তার উত্তর শুনে উপস্থিত জনতা তাকে ছেলেধরা আখ্যা দিয়ে মুহূর্তেই তার প্রতি চড়াও হয়ে গেল। সে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করলো ‘আমি ছেলে ধরা না।’ তাও কিছু উশৃঙ্খল যুবক তার ওপর হামলে পড়লো। সে বললো, ‘আমি বাসায় রেখে আমার দুইটা ছোট ছেলে-মেয়ে, দয়া করে আমাকে মারবেন না, আমি ভালো ঘরের মেয়ে।’ কে শুনে কার কথা?

অতিউৎসাহীরা কোনোভাবেই ছাড়তে রাজি নয়। হাকডাক দিয়ে জড়ো করে ফেলা হলো শতাধিক মানুষ। সবার উদ্দেশে একটা নারী ছেলে ধরাকে জীবনের মতো শায়েস্তা করবে। শুরু হলো বেধড়ক পেটানো। সে দৌড়ে পালাতে চেয়েছিল তখন উশৃঙ্খল জনগণ তাকে ধরে এনে উপর্যুপরি কিল ঘুষি, লাত্থি মারতে শুরু করলো। কিছু লোক লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটালো, সে আর্তচিৎকার করতে লাগলো। কাউকেই থামাতে পারলো না। কেউ একজন এসে এই উশৃঙ্খল উন্মাদ জনতাকে থামাবে ভাবছিল সে। কেউ থামাতে চেষ্টা করলেও বাকিরা কর্ণপাত করেনি।

একের পর এক আঘাতে শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছিল। একটা ছেলে লাফ দিয়ে বুকের ওপর উঠে গেল। তখন হৃদপিণ্ডটা থমকে গেছে। আরেকটা ছেলে লাফ দিয়ে বুক আর গলার মাঝখানে আঁছড়ে পড়লো। মাথায় আঘাতের পর আঘাতে সে পুরোপুরি বোধ শক্তি হারিয়ে ফেললো ততক্ষণে, এখন তাকে যতই আঘাত করা হচ্ছে তার কোথায় কোনো ব্যথা অনুভূত হচ্ছে না। সে ক্ষীণ চোখ মেলে দেখতে পারছে তার ওপর পাষণ্ডরা আঘাতের পর আঘাত করছে। তার কোনোই কষ্ট হচ্ছে না। সে ততক্ষণে কষ্ট বেদনার অনুভূতি শূন্য হয়ে গেছে।

তার শুধু মনে পড়লো তার ছেলেকে স্কুলে রেখে এসেছে, মেয়েকে খেলনা দিয়ে খেলতে বসিয়ে এসেছে। ছেলেটা কীভাবে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরবে? মেয়েটা মাকে ছাড়া এক রাত কারো সাথে ঘুমায়নি। আহা ফুটফুটে মেয়েটার কি হবে? কিছুক্ষণ পর সে আর জনতার হৈ-হুল্লোড় শুনতে পাচ্ছে না। অনুভব করছে শক্ত কোন ফ্লোরে শুয়ে আছে, রাস্তার ঝাঁকুনি তার মৃদু অনুভূত হচ্ছে।

পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে গেছে। চোখ অন্ধকার ঘিরে ধরেছে । চোখ খোলার সামর্থ্য তার নেই। আস্তে আস্তে হৃদপিণ্ডের গ্রাফ নিচে নেমে যাচ্ছে, চোখ বেয়ে অনর্গল পানি পড়ছে। সে বুঝতে পারছে হায় দুনিয়া তাকে দূরে ঠেলে দিলো। কি হবে তার ছেলে মেয়ের?

সারা শরীরে একটুও রক্তক্ষরণ নেই, ঠোঁটে দাঁতের আঘাতে সামান্য রক্ত বেরিয়েছিল তাও শুকিয়ে গেছে। তবে সারা শরীরে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। সাদা শরীর কালো হয়ে গেছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ নেই। গুলিতেও শরীর ঝাঁজরা হয়নি। তবুও আস্তে আস্তে হৃদপিণ্ডের গ্রাফ নিচে নেমে যাচ্ছে, ধমনিতে স্থবিরতা নেমেছে। অস্তে আস্তে শরীর শীতল হয়ে যাচ্ছে। হাত-পা কিছুই নাড়ানো যাচ্ছে না। কেউ একজন পরম যত্নে তাকে ডাকছে। বলছে তার তৃষ্ণা মেটানোর জন্য যম প্রস্তুত।

কিছুক্ষণ পর ডাক্তার ঘোষণা দিলেন রেনু আর বেঁচে নেই। ময়নাতদন্তে দেখা গেলো রেনুর কষ্টে ভরা বুকের হাড় ভেঙ্গে হৃদপিণ্ডে ঢুকে গেছে, এ যেনো কষ্টের চির অবসান, মাথার মগজ নাক অবধি চলে এসেছে। হায় দুনিয়া, হায় মানুষ, হায় জীবন। হায় সমাজ, হায় মানবতা, হায় মানবাধিকার, হায় অনুভূতি।

বাঙালি তোমরা বেঁচে থাকো মানুষ নয় পশু হয়ে।

Comments

comments

জানুয়ারি ২০২০
রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
« ডিসেম্বর    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  

২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। নবধারা নিউজ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Development by: webnewsdesign.com