Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ nobodharanews

অস্ট্রেলিয়ান সংবাদ
৪:৩১ এএম, ১১ ডিসেম্বর ২০১৫

আদালতের সাতকাহন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

  চল্লিশের দশকে তখনকার সামাজিক বাস্তবতায় সলিল চৌধুরী লিখেছিলেন ,বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা । পরবর্তী দশকের পর দশক ধরে এই গান মানুষের হৃদয়ের কথা বলে যাচ্ছে । আবেগ আর অনুভূতির কথা বলে যাচ্ছে । আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার যতগুলো অনুপ্রেরনাদায়ক গান ছিল তার মধ্যে এই গানটি অন্যতম । কখোনো মানুষ […]

আদালতের সাতকাহন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
৭ মিনিটে পড়ুন |
 
আদালতের সাতকাহন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
চল্লিশের দশকে তখনকার সামাজিক বাস্তবতায় সলিল চৌধুরী লিখেছিলেন ,বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা । পরবর্তী দশকের পর দশক ধরে এই গান মানুষের হৃদয়ের কথা বলে যাচ্ছে । আবেগ আর অনুভূতির কথা বলে যাচ্ছে । আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার যতগুলো অনুপ্রেরনাদায়ক গান ছিল তার মধ্যে এই গানটি অন্যতম । কখোনো মানুষ বিচারপতির রুপে অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠিকে কল্পনা করেছে , আবার কখোনো সত্যিকারের বিচারপতিদেরও । বাস্তবতা হচ্ছে , চল্লিশের দশক বলেন বা এখনকার সময়ে, বিচারপতিদের জন্য এই সমাজ ও আইন একটি সুউচ্চ আসন বরাদ্দ রেখেছে । আমাদের প্রচলিত আইনে ও সাধারন ব্যবস্থায় একজন বিচারপতি নিজে বিচারের আওতাধীন নন । তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করতে হয়। যা খুব সহজ কিছু না ।
 
সুতরাং বিচারপতিদের বিচার কারা করবে সেই বিষয় নিয়ে এই গানের কথাগুলো যথার্থই মনের কথা বলে এতদিন ধরে এই গানের আবেদন এতটুকুও কমেনি । বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিচারপতিদের সাথে সাধারন জনগনের দূরত্ব কখোনোই কমেনি । বরং দূরত্বের মাত্রা আস্তে আস্তে বাড়ছে । দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে চার দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে । এই সময়কালে আমাদের একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও বিচারিক কার্যক্রমের উপরে জনগণের আস্থা খুব সাধারনভাবেই ফিরে আসার কথা ছিল । কিন্তু সেটা হয়নি । বরং বিচারপ্রক্রিয়ার ত্রুটি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে যারা লেখালেখি করেছেন , তাদের শত বছরের পুরোনো বৃটিশ আইনে আদালত অবমাননার দায় ঘাড়ে নিতে হয়েছে ।
 
বিভিন্ন সময়ে বিচারপতিরা নিজেরাই রাজনীতিতে জড়িয়েছেন । কেউ কেউ ক্ষমতার অংশিদার হয়েছেন । আবার কেউ কেউ ক্ষমতাসীনদের সাথে সখ্য গড়ে সাধারন জনগণের প্রত্যাশায় ছাই ঢেলে দিয়েছেন । আরো পরিস্কার করে বললে জনগণ তাদের অধিকার সংরক্ষনের আশায় বিচারপতিদের যে সাংবিধানিক ক্ষমতা দিয়েছেন , সেইসব ক্ষমতা অনেকাংশে জনগণকে সংরক্ষনের বদলে শাসকগোষ্ঠির হাতিয়ার হিসেবে কাজে লেগেছে ।
 
অনেকেই একমত হবেন, বাংলাদেশ আজকে যে একদলীয় শাসনের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে , এর পেছনে বর্তমান শাসকগোষ্ঠির উচ্চাভীলাষ যেমন দায়ি তেমনি বিচারপতি খায়রুল হকের বিতর্কিত একটি সিদ্ধান্তও দায়ি । বিচারপতি খায়রুল হক তত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দেন । সেই সাথে এই সরকার পদ্ধতি বাতিলের পরে যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে সেই সময়কালে কি করা উচিত এমন কোনো নির্দেশনা তিনি দেননি । যে সুযোগটি বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠি নিয়েছে । তারা শুধু সংসদ নির্বাচনই নয়, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট আইজীবি সমিতি , জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত, সকল নির্বাচন বিধিকে একটি প্রহসনে পরিনত করেছে।
 
খায়রুল হকের বিতর্কিত সেই রায়ের ফলাফল হিসেবেই বাংলাদেশের ৩০০ আসনবিশিষ্ট সংসদে ১৫৪ জন অনির্বাচিত । দেশের মানুষ তাদের প্রতিনিধি সংসদে পাঠাতে সক্ষম হয়নি । ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী যে প্রহসনের নির্বাচন হেয়েছে , সেটার দায় যেমন একদলীয় শাসনের স্বপ্নে বিভোর বর্তমান সরকারের , তেমনি আদালতেরও ।
 
বাংলাদেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন, নির্বাচনী আমেজ আর পাল্টাপাল্টি প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের কাছে যাওয়ার যে রাজনীতি চালু হয়েছিল , সেগুলো এখন অতীত । তত্বাবধায়ক সরকারের সফল কার্যকরীতার ফলেই বার বার গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকার পরিবর্তন হয়েছিল। আর তাই দলগুলোকে জনগণের সামনে পরীক্ষা দিতে হতো । সন্দেহ নেই, এই প্রাকটিস আরো কয়েকবার চললে দেশে প্রকৃত গনতন্ত্রের স্বাদ সাধারন মানুষ পেতই ।
 
খায়রুল হককে তার সেই সময়কার সরকারপক্ষের ভূমিকার কারনে অবসরের পরে পুরস্কার দেয়া হয়েছে । তাকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে । তিনি একটি লাভজনক পদের আশায় বিতর্কিত রায় দিয়েছেন কিনা সেই প্রশ্ন থাকবেই ।
 
শুধু বিচারপতি খায়রুল হকই নন, তার উত্তরসূরীদের মধ্যেই এই প্রবনতা এখন মহামারী আকারে ছড়িয়েছে । সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবিরা অনেক সময় মজা করে বিচারপতিদের একটি গ্রুপকে বিচারপতি লীগ বলে ডাকেন । শুধু ডাকাডাকির মধ্যে আর বিষয়টা সীমাবদ্ধ নেই, আক্ষরিক অর্থেই তারা বিচারপতিদের একটি গ্রুপকে সরকার দলীয় অংগ সংগঠনের মত আচরন করতে দেখছেন বলেই বলছেন ।
 
একে তো আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত কখোনোই সাধারন জনগণের জন্য ছিলনা । আদালতে যাওয়ার যে ঘটা , যে খরচ আর নিয়ম কানুন, তার উপরে আছে ইংরেজীতে রায় লেখা , সবকিছু মিলিয়ে আদালত সাধারন জনগণের নাগালের বাইরেই ছিল ,এখনও তাই আছে । তারপরেও সর্বোচ্চ আদালতে পায়সাওয়ালারা যেতে পারতো । হয়তো নিরপেক্ষ বিচারের আশাও থাকতো। কিন্তু এখন সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে ।
 
মামলায় আসামী যদি বিরোধী পক্ষের হয়, তবে অনেক আইনজীবি কোন কোর্টে মামলা যাবে শুনেই বলে দিতে পারেন বেইল হবে কি হবে না । ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি দলিয় প্রার্থি মির্জা আব্বাসের একটি জামিন নিয়ে দুই সদস্যের আদালত বিভক্ত রায় দিয়েছিল। বিষয়টি পরে হাস্যরসের কারন হয়ে দাাঁড়ায়। অবস্থা এমন হয়েছে যে আমাদের দেশের একটি সাধারন জামিনের প্রশ্নেও দুই মতের দুই বিচারপতি এক হতে পারেন না ।
 
কিছুদিন আগে বিচারপতি শামসুদ্দিন হায়দার মানিক এর সাথে প্রধান বিচারপতির একটি কথোপকথন প্রকাশ হয়। আর সেই কথপোকথনে দেখা যায় , বিচারপতি মানিক বিএনপির সিনিয়র নেতা মওদুদ আহমেদের মামলা নিজের কোর্টে চাচ্ছেন । ভাবুন একবার ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য যদি একজন বিচারপতি কোনো এক বিরোধী রাজনীতিককে অপমানের আশায় তার মামলা পাওয়ার জন্য তদবির করেন, তবে বিচারব্যবস্থার অবস্থা নিয়ে খুব বেশি উদাহরন দিতে হয় না ।
 
পার্শবর্তি দেশ ভারত ও পাকিস্তান তাদের বিচারব্যাবস্থাকে শুধু স্বাধীনই করেনি , এর চর্চাও করেছে পুরোদমে । পাকিস্তানে আদালতের ভূমিকার কারনের পারভেজ মোশাররফকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। আর বিগত সরকারের সময়ও ইউসুফ রাজা গিলানীকে প্রধানমন্ত্রী পদের অযোগ্য ঘোষনা করে আদালত । ফলে তাকেও পদত্যাগ করতে হয়েছিল।
 
এটাই নিয়ম । সাধারন মানুষের একটি ভরসাস্থল তো থাকা চাই । যেখানে সে নালিশ করতে পারবে । হোক সেটা সরকারের বিরুদ্ধে কিংবা কোনো ক্ষমতাসীন আমলার বিরুদ্ধে । সেই সুযোগ বাংলাদেশে নেই । বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিবচেনায় সরকারদলীয়দের মামলা খারিজ হয়। আবার একই কারেনে বিরোধীদের নামে মামলার পর মামলা হতেই থাকে । বাংলাদেশে সরকার দলীয় এমপি নিজের হাতে একটি শিশুকে গুলি করার পরেও তার জামিন হয়ে যায়, আর বিরোধী দলের মহাসচিবকে বাস পোড়ানোর ভৌতিক অভিযোগে জেলে থাকতে হয়। সরকার তো চাইবেই এগুলো । এসবে জনগণ আর অবাক হয় না । জনগণ অবাক হয় আদালতের ভূমিকায়।
 
আদালত প্রায়ই সুয়োমটো ( স্বপ্রেনোদিত রুল) জারি করেন । বিভিন্ন বিষয়ে তারা এটা করে থাকেন । কিন্তু আজ পর্যন্ত আদালত শাসক দলের বিরুদ্ধে , বা ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন কেন অবৈধ হবে না, এমন কোনো সুয়োমটো জারি করেনি । এমনকি সরকার দলীয় ক্যাডাররা সুপ্রীম কোর্ট চত্বরে মারামারি করলো । কোর্টের মধ্যে ঢুকে ইচ্ছেমত আইনজীবিদের মারধোর করলো, আগুন ধরিয়ে দিল কোর্টের বিভিন্ন জায়গায়। সেই ঘটনায়ও আমাদের সুপ্রীম কোর্ট কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি । সরকারের ইচ্ছের সামনে আদালত নিজেরা নিজেদের রক্ষা করতেই সক্ষম না বলে ধারনা করলে সেটা ভুল হবে না ।
 
সরকার বিভিন্ন সময়ে তাদের পক্ষের কাজগুলো আদালতকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছে । বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়াকে তার বাসভবন থেকে সরিয়ে দেয়া, জিয়াউর রহমানের শাসনকাল অবৈধ ঘোষনা করা থেকে শুরু করে কর্নেল তাহেরের বিচার ইত্যাদি প্রশ্লে আদালত সরকারের ক্রীড়ানকের ভূমিকা পালন করেছে বলেই সাধারন মানুষের ধারনা ।
 
সর্বশেষ মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার করতে গিয়ে বাংলাদেশের আদালত স্মরনকালের মধ্যে সবথেকে বেশি বিতর্কিত হয়েছে । বিচারপতি নিজামুল হকের সেই বিতর্কিত স্কাইপে সংলাপ থেকে শুরু করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায় আগেই ইন্টারনেটে আউট হয়ে যাওয়া , সাঈদির মামলার প্রধান সাক্ষিকে ইন্ডিয়ায় পাচার করা সত্বেও তাকে ফেরানোর উদ্যোগ না নেয়া , বিভিন্ন রায়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া, দেশের বিরোধী মতের অনেককে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করা সহ অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে । বাংলাদেশের একটি ইমোশনাল ইস্যুকে পুঁজি করে দেশের প্রায় প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার যে প্রক্রিয়া সেই প্রক্রিয়ায় আদালতও বাদ যায়নি ।
 
স্বাধীন প্রতিষ্ঠান বলতে বাংলাদেশে আর কিছু অবশিষ্ট নেই । পুলিশ বিভাগের নিরপেক্ষতা তো অনেক আগেই গেছে । শুধু একটু লজ্জার আবরণ ছিল। এখন তাও নেই । এখন পুলিশের উপরোস্থ অফিসাররা রীতিমত সরকারী দলের হয়ে বক্তৃতা বিবৃতি দেন । নিয়মিত বিরোধী দলের নেতা নেত্রীদের গালাগাল করেন । টকশো করে বেড়ান । শুধু পুলিশ কেন , প্রায় সবগুলো সাংবিধানিক প্রতষ্ঠানই নিরপেক্ষতা হারিয়ে ধ্বংসের মুখে ।
 
বিচারপতিদের বেলায় অবশ্য লজ্জার আবরনটি এখনও আছে । এখনও বিচার মানে নিরপেক্ষ বলে সাধারনভাবে মনে করা হয়। এখনও কোনো বিচারপতি অন্তুত মুখে বলছেন না যে আমি নিরপেক্ষ বিচার করবো না । তবে সেই লজ্জার আবরনটি আর কতদিন থাকে তা নিয়ে শঙ্কিত হওয়াই যায়। হয়েতো অচিরেই বিচারপতিদেরও আমরা দেখবো নিয়মিত রাজনৈতিক বক্তৃতা দিতে । হয়তো দেখবো কোনো এক বিচারপতি টকেশোতে হাজির হয়েছেন , আর পুরোটা সময় অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর গুনগান করছেন ।
 
সলীল চৌধুরীর গানের কথাগুলোর মত যদি সত্যি সত্যিই জনগণ না জাগে , তবে এই দৃশ্য দেখতে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে হয় না।
 
মিজানুর রহমান সুমন নিউজ এডিটর জনতার নিউজ২৪ ডটকম।
 
Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর

সিডনি প্রবাসীদের ঈদুল ফিতর উদযাপন
৩ বছর আগে
সিডনিতে স্মরণ সভা ও একুশের আলোচনা অনুষ্ঠিত
৩ বছর আগে
সিডনির সফল রেস্টুরেন্ট উদ্যোক্তা মিল্টন
৪ বছর আগে
সিডনিতে বাংলাদেশী ডেন্টিস্টদের মিলনমেলা
৪ বছর আগে
সিডনির ল্যাকাম্বায় বাণিজ্য মেলার আয়োজন
৪ বছর আগে

Advertise with us
Advertise with us
আরও nobodharanews সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com