অপহরণের চার দিনের মাথায় নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে গতকাল বুধবার সন্ধান মিলেছে অপহৃত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র এবং ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ ছয়জনের লাশ। গত রোববার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে নজরুলসহ ৫ জন ও ড্রাইভারসহ অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার অপহৃত হন। এখন শুধু কাউন্সিলর নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের সন্ধান মেলেনি। […]
অপহরণের চার দিনের মাথায় নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে গতকাল বুধবার সন্ধান মিলেছে অপহৃত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র এবং ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ ছয়জনের লাশ। গত রোববার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে নজরুলসহ ৫ জন ও ড্রাইভারসহ অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার অপহৃত হন। এখন শুধু কাউন্সিলর নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের সন্ধান মেলেনি। নজরুলকে তার গাড়ি থেকে ভিন্ন গাড়িতে তুলে অপহরণ করা হলেও ড্রাইভারসহ তার গাড়িটিও অপহরণকারীরা হাইজ্যাক করেছিল। পরে গাজীপুরে বনের মধ্যে পরিত্যক্ত অবস্থায় গাড়িটি পাওয়া যায়। নজরুলের ড্রাইভার জাহাঙ্গীরের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনও জানা যায়নি। বাকি যে চারজনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে, তারা হলেন কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের গাড়িতে থাকা তাজুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান স্বপন ও লিটন এবং আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিম। বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতার মোরশেদ ছয়টি লাশ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে বুধবার দুপুরে বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়ন এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে প্রথমে তিনটি লাশ ভেসে ওঠে। পরে আশপাশে আরও তিনটি লাশের সন্ধান মেলে। বন্দর থানার ওসি এর আগে জানিয়েছিলেন, স্থানীয় লোকজন কলাগাছিয়া ইউনিয়ন এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে তিনটি লাশ ভেসে ওঠার খবর পুলিশকে জানান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ তিনটি উদ্ধার করে। লাশগুলো পচে গন্ধ বের হচ্ছিল। পরে আরও তিনটি লাশের সন্ধান পাওয়া যায়। গতকাল বেলা ৩টায় বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় প্রথমে একটি লাশ উদ্ধার করা হয়। প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের লাশ তার ছোটভাই আবদুস সালাম শনাক্ত করেছেন। একই সময় নজরুলের লাশের সঙ্গে নদীর একই এলাকায় ১ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে আরও ৫টি লাশ নদীতে ভেসে ওঠে। নজরুলের সঙ্গেই অপহৃত স্বপনের লাশ তার ছোটভাই রিপন এবং তাজুল ইসলামের লাশ তার বোন শিরীন আক্তার শনাক্ত করেন। একই দিন ড্রাইভারসহ অপর অপহৃত অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিমের লাশ শনাক্ত করেন তার ভাগ্নে আবু বক্কর ও সাঈদ। পরে অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকার ও নজরুলের সহযোগী লিটনের লাশও তাদের স্বজনরা শনাক্ত করেন। এদিকে অপহৃতদের লাশ পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। সড়ক অবরোধ বিক্ষোভ এদিকে কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ অপহৃতদের লাশ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধারের খবরে সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় বিকাল ৪টা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে গাড়ি ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। বিক্ষোভকারীরা সড়কের ওপর বড় বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ফলে সড়কটির মৌচাক থেকে সানারপাড় পর্যন্ত একেবারেই ফাঁকা হয়ে যায়। যানজটের সৃষ্টি হয় যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত। গত রোববার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে তিন সহযোগীকে নিয়ে নাসিকের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম একটি প্রাইভেটকারে বের হন। কাউন্সিলর নজরুলের গাড়ির ঠিক সামনেই নারায়ণগঞ্জ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের ব্যক্তিগত গাড়িটি আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে যায়। এরপর থেকেই দুটি প্রাইভেটকারে থাকা ওই ৭ জন নিখোঁজ হন। চার সহযোগীসহ অপহৃত কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং ব্যক্তিগত চালকসহ অপহৃত নারায়ণগঞ্জ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকারকে উদ্ধারের দাবিতে গতকাল বুধবারও দিনব্যাপী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করে পৃথক পৃথক বিক্ষোভ হয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মৌচাক থেকে সানারপাড় পর্যন্ত অংশে অবস্থান নিয়ে নজরুলের সমর্থকরা বিক্ষোভ করেন। বেলা ২টায় নজরুলের সমর্থকরা আজ বৃহস্পতিবার ভোরের মধ্যে সহযোগীদেরসহ নজরুলকে উদ্ধারের দাবি জানিয়ে অবরুদ্ধ সড়ক থেকে সরে দাঁড়ায়। কিন্তু বেলা সাড়ে ৩টায় নজরুলসহ তার সহযোগীদের লাশ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধারের খবরে নজরুল ইসলামের বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা আবারও রাস্তায় নেমে আসে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। এদিকে টানা তৃতীয় দিনের মতো আইনজীবীরা আদালত বর্জন করেন অপহৃত আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের সন্ধান দাবিতে। প্রথমে তারা আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন। পরে সকাল ১১টায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডটি অবরোধ করেন। ওই সময় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আসার সময় আইনজীবীদের বাধার মুখে পড়েন। পরে তিনি গাড়ি থেকে নেমে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যান। ওই সময় তিনি বিক্ষুব্ধ আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, অপহৃতদের উদ্ধারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে আইনজীবীরা ডিআইজির আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারেননি। এদিকে বেলা ৩টায় বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ৩টি লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে বন্দর থানার ওসি আক্তার মোরশেদ ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে নদী থেকে একে একে ৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি লাশের হাত-পা বাঁধা ছিল এবং লাশ যাতে নদীতে ডুবে থাকে সে জন্য বস্তার মধ্যে ১২ থেকে ২৪টি করে ইট দিয়ে সেগুলো লাশের দেহের সঙ্গে বেঁধে দেয়া হয়। প্রথমে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা এবং মুখে দাড়ি আছে এমন একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে লাশটি নাসিকের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের বলে শনাক্ত করেন নিহতের ছোটভাই আবদুস সালাম। নিহত নজরুলের হাত পিঠমোড়া করে এবং পা বাঁধা ছিল। লাশ যাতে ভেসে না ওঠে, সেজন্য নজরুলের পেট ফেঁড়ে দেয়া হয়। বন্দর থানার ওসি আক্তার মোরশেদ বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীর শান্তিনগর এলাকার তীর থেকে ৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, যার ৪টির পরিচয় তার স্বজনরা শনাক্ত করেছে। লাশ উদ্ধার করতে যাওয়া বন্দর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মোকাররম হোসেন সাংবাদিকদের জানান, এলাকাবাসীর কাছে খবর পেয়ে আমরা লাশ উদ্ধার করতে এসেছি। প্রতিটি লাশই ইট দিয়ে বাঁধা ছিল। যেন লাশ ভেসে উঠতে বাধাগ্রস্ত করতেই এটি করে থাকতে পারে। চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিহিত লাশটি প্রথমে শান্তিনগর এলাকা থেকে উদ্ধার করি। এদিকে লাশ উদ্ধারের পর নাসিক মেয়র সেলিনা হায়াত্ আইভী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এ শহরকে লাশের শহর বানানো হয়েছে। ভীতিকর এক অবস্থা বিরাজ করছে নগরবাসীর মধ্যে। এখন আর কেউ নিরাপদ নয়। প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে নারায়ণগঞ্জ পরিণত হয়েছে ভয়ঙ্কর নগরীতে। এ অবস্থা চলতে পারে না। বিষয়টি সরকারের উচ্চ মহলকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। অন্যথায় অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে নারায়ণগঞ্জ।