এই লেখাটির শিরোনামই বাংলাদেশের জন্য লজ্জার । বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জঙ্গিবাদ শব্দটি এভাবে কখোনো আসবে সেটাই একটি অবাক করা বিষয়। কিন্তু অনেক অবাক করা বিষয়ই এখন বাংলাদেশে ঘটছে । হয়তো সামনে আরো ঘটবে । দেশের সামগ্রিক অবস্থায় জঙ্গিবাদও একটি গুরুত্বপূর্ন শব্দ হয়ে গেছে । যা দেশের সাধারন মানুষের ভাবনার বিপরীত। শত শত বছর […]

এই লেখাটির শিরোনামই বাংলাদেশের জন্য লজ্জার । বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জঙ্গিবাদ শব্দটি এভাবে কখোনো আসবে সেটাই একটি অবাক করা বিষয়। কিন্তু অনেক অবাক করা বিষয়ই এখন বাংলাদেশে ঘটছে । হয়তো সামনে আরো ঘটবে । দেশের সামগ্রিক অবস্থায় জঙ্গিবাদও একটি গুরুত্বপূর্ন শব্দ হয়ে গেছে । যা দেশের সাধারন মানুষের ভাবনার বিপরীত।
শত শত বছর ধরে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্নভাবে বসবাস করছে । দেশে এই কথাগুলো খুবই প্রচলিত যে আমাদের সাধারন জনগন ধর্মভীরু বটে তবে ধর্মান্ধ নয়। ধর্মান্ধ আর ধর্মভীরু বিষয় দুটি আলাদা । পৃথিবীর কোনো দেশেই সম্ভবত সাধারন জনগণ জঙ্গিবাদের সমর্থক নয়। তারপরেও উগ্রবাদ বলতে একটা কথা আছে । আরবের জনগণ যত সহজে মানুষ খুন করবে , ততটা সহজে বাংলাদেশের জনগণ করতে পারে বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন না । বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে বলতে গেলে শান্তিপ্রিয় , আরামপ্রিয় ইত্যাদি বিশেষন প্রায়ই আসে ।
সেই দেশের মানুষ হয়ে আমাদের দেখতে হচ্ছে আমাদের দেশে কিভাবে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে । এর কারন বিশ্লেষন করতে গেলে আমাদের পরিচিত পথে এগুনোটাই সহজ । আমরা উগ্র না তা যেমন সত্য, আমরা ক্ষমতালোভী এটাও তেমন সত্য।
নারায়নগঞ্জে এক সাথে সাতটা মার্ডার হয়েছে । কেউ কেউ বলেন , সংখ্যাটা আসলে সাত না, এগারো জন। আর যারা খুন করেছেন , তারা বাংলাদেশের আইনের লোক, র্যাব বা কিছু সামরীক বাহিনী থেকে পদায়ন হওয়া অফিসার । আর সেই সাখে আছে রাজনৈতিক যোগসাজস । আমাদের দেশের আদালত বিষয়টিতে শেষ পর্যন্ত কি সিদ্ধান্ত দেয় সেটা অপেক্ষা করলে বোঝা যাবে । তবে এতগুলো খুন যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজসে হতে পারে , তবে সেই ক্ষমতার লোভ আমাদের অনেক নিচেও নামাতে পারে ।
প্রসঙ্গত দেখা যাক , জঙ্গিবাদের উত্থানের সময়কার চিত্র । বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া প্রায়ই বলে থাকেন , শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে । গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মুফতি হান্নান নামের আফগান ফেরত এক জঙ্গি বাহাত্তর কেজি ওজনের একটি বোকা পুতে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলো । সেই স্থানটি ছিল শেখ হাসিনার জনসভাস্থল। বোমা ফাটার আগেই সেটি উদ্ধার করা হয়েছিল। মুফতি হান্নার পরবর্তীতে গ্রেফতার হন ।
পরে খালেদা জিয়ার শাসনামলে দুই জঙ্গি নেতা বাংলা ভাই ও শায়খ রহমানের আবির্ভাব ঘটে । তাদের শুরুর দিকটায় খালেদা জিয়ার সরকার দেশে কোনো জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নেই বলে বিবৃতি দিতে থাকে । যা পরে সমালোচিত হয়। শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সরকারই এই দুই জঙ্গি নেতাকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করতে সক্ষম হয়।
তারপরে দীর্ঘদিন বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ শব্দটি মানুষ ভুলে থাকতে পেরেছে । কিন্তু মুল বিপত্তিটা ঘটেছে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে এসে ।
এই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জঙ্গিদের আসল ইনটেনশন নিয়ে একটু বিশ্লেষন করা যাক । জঙ্গিদের আসল উদ্দেশ্য কি হতে পারে । এটা বুঝতে খুব বেশি মাথা খাটাতে হয়না । তাদের ইনটেনশন হতে পারে দেশে নাস্তিক্যবাদের প্রচারকে বাধাগ্রস্ত করা । নাস্তিক লেখক ও ব্লগারদের উপরে হামলা এগুেলোর কারনেই ঘটেছে বলে মনে হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে গত কয়েকমাস ধরে এমন কি ঘটলো যে এই হামলার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেল? প্রশ্ন আরো আছে, বিদেশী দুইজন নাগরীককে যে হত্যা করা হলো ,তারা তো এই আস্তিক নাস্তিক হিসেব নিকেশের অংশ নয়। তবে কেন তাদের হত্যা করা হলো ? প্রকাশক দীপন একজন বিএনপি সমর্থক বাবার ছেলে। দীপনের নিজের নাস্তিকদের পক্ষে কোনো ভাষ্যও পাওয়া যায় না। দেশের বড় বড় অবিশ্বাসীকে রেখে দীপনকে কেন টার্গেট করা হলো ? রাজনীতি যদি এখানে যুক্তই না থাকে তবে , সরকার একটা ঘটনায়ও কেন হত্যাকারীকে ধরতে পারলো না ? ব্লগার রাজীব, যিনি থাবা বাবা নামে লিখতেন, তার হত্যাকারী হিসেবে যাদের ধরা হলো, সেই ৫ জনের সাথে বড় কোনো জঙ্গি গ্রুপের মদদ আবিস্কারে সরকার ব্যর্থ হয়েছে । তখন বলা হয়েছিলো তারা অনেকটা নিজস্ব উদ্যোগে এই কাজটি করেছে । যদি তাই হয় , তবে পরবর্তীতে এতগুলো ঘটনা কি প্রমান করে, সেই গ্রেফতারটি কি ভুল ছিল ?
আগেই বলেছি , বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ এই বিষয়গুলোকে সমর্থন করার প্রশ্নই আসে না । সেই দিক থেকে দেখতে গেলে ঘটনাগুলির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সম্পৃক্ততা যাচাই না করে আর উপায় থাকে না।
এই ঘটনাগুলোর সাথে বাংলাদেশে অনির্বাচিত একটি সরকারের দেশ সাশন , তাদের আশঙ্কাজনকভাবে জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়া , বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য স্পেস না থাকা , অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে বৈদেশিক চাপ, নতুন নির্বাচন , দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া এমন অেনেক বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে ।
প্রথকে সরকারী ভাষ্য যদি খেয়াল করি, তবে তাদের বামপন্থি নেতৃত্ব প্রকাশ্যেই এই ধারনা পোষন করেন যে বিরোধী জোটের গুরুত্বপূর্ন দুটি দলের এতে সম্পৃক্ততা আছে । বিএনপির একটি ডানপন্থি অংশ ও জামায়াতে ইসলামী এইসব ঘটনায় মদদ দিচ্ছে । হতে পারে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে সরকার একতরফা যে প্রহসনের নির্বাচন করেছে তাতে করে এই দুটি দল সথেকে বেশি সংক্ষুব্ধ । তারা রাজনৈতিক স্পেস না পেয়ে এই ধরনের জঙ্গিবাদকে সমর্থন দিচ্ছে ।
এই সম্ভাবনা যদি আমরা বিবেচনা করি , তবে অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে চলে আসে । গত তিন মাস এই ধরনের জঙ্গিবাদ অনেক বেশি বেড়েছে । খেয়াল করেন , ২০১৪ সালের জানুয়ারীতে যে ঘটনা ঘটেছে তার প্রতিক্রিয়া তারা এতদিন পরে এভাবে কেন দিবে ? আবার বিদেশী নাগরীক হত্যা করে এই দল দুটি কি বোঝাতে চাইছে? আওয়ামী লীগ ও বিএনপির যে সাপে নেউলে সম্পর্ক তাতে করে আওয়ামী লীগ যেটা দীর্ঘদিন দেখাতে চাইছে , সেই পথে বিএনপির পা দেয়ার কথা কিনা ? আওয়ামী লীগ সরকার পশ্চিমাদের কাছে তাদের ক্ষমতায় থাকার কারন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসলে যে তারা জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকানোর জন্য ক্ষমতায় আছে । দেশে জঙ্গি বেড়ে যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী তাদের এই ভাষ্যগুলোকে বাস্তবায়ন করার মত রিস্ক নেয়ার কথা কিনা ? একই সাথে সরকার বলতে চাইছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্থ করার জন্য এই ঘটনাগুলো ঘটে থাকতে পারে । যদি তাই হয় , তবে এখনই কেন? জামায়াতে ইসলামীর দুই নেতাকে ইতিমধ্যেই ফাঁসিতে ঝুলাণো হয়েছে । এই প্রকৃয়ায় সেই ফাঁসি রক্ষা করা গেলে
তারা আগেই করতো কিনা ? যখন জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষনা করা হয়, তখনই দলটির সবথেকে বেশি সংক্ষুব্ধ হওয়ার কথা ছিল কিনা ?
যেখানে জামায়াতে ইসলামীর আমীর থেকে শুরু করে প্রায় সব কজন শীর্ষ নেতাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে, সবাই এখন জেলেই আছেন । সেখানে তাদের মদদে এই ধরনের হত্যাকান্ড ঘটে থাকলে পুলিশ তাদের ধরতে পারছে না , এটা কি করে সম্ভব ? একটি ঘটনায় জামায়াতের সম্পর্ক আবিস্কার করতে পারলে সরকারের যে পরিস্কার লাভের জায়গাটি আছে, সেটা তারা হাতছাড়া করতে চাওয়ার কথা না ।
বিএনপির নেতারা দাবী করছেন সরকারী দলের মদদে এগুলো হচ্ছে । তাদের দাবি মতে সরকারী দল থেকে অনেক আগে থেকেই দেশে জঙ্গিবাদের ধুয়া তুলে পশ্চিমাদের দৃষ্টি আকর্ষনের একটি চেষ্টা ছিল। আর সেটি এখন তারা নিজেরাই বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে । আওয়ামী লীগ সরকার তাদের ক্ষমতায় থাকার গ্রহনযোগ্যতা প্রমান করতে গিয়ে এই ঘটনাগুলো দরকার ছিল। যেহেতু অতীতে অনেক হত্যাকান্ডের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মদদ এর প্রমান পাওয়া গেছে, সেহেতু এই ঘটনাগুলো সরকার ঘটিয়েছে এমন হওয়াটাও বিচিত্র নয়। ব্লগারদের নেতা ইমরান এইচ সরকারও বিষয়টিতে সরকারী মদদের কথা বলেছেন ।
তবে বাংলাদেশ সরকার যদি এগুলো করে থাকে , তাহলেও অনেকগুলো প্রশ্ন আমাদের ভাবিয়ে তোলে। সরকার যদি এটা দেখাতে চায় যে তারা জঙ্গিবাদের প্রতিরোধকারী। তবে দিনের পর দিন একই ধরনের হামলা হলে তাদের সুনামের থেকে দুর্নামই তো বেশি হওয়ার কথা । বরং মানুষ এটা বেশি করে বলবে যে আওয়ামী লীগ সরকার জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতে সক্ষম হয়নি ।
এমনিতেই জনসমর্থনহীন একটি সরকার তাদের ইমেজ ধরে রাখতে যেখানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নতুন উপদ্রপ মাথায় নেয়ার যুক্তি নেই । সরকারের নানান মন্ত্রীরা বিষয়টির সাথে যুদ্ধাপরাধী ইস্যু কিংবা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে জড়িয়ে বক্তব্য দিলেও এটা পাবলিকের কাছে হাস্যকর খোড়া যুক্তি মনে হয়। বেশিরভাগ জনগণই জানেন যে দেশে যাই ঘটুক , বিগত সাত বছর এই একই ধরনের বক্তব্য তারা দিয়ে আসছে । সুতরাং এই জঙ্গিবাদ থেকে কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক সুবিধা আওয়ামী লীগ ও বামদের যে সরকার তারা আদায় করতে পারছে বলে মনে হয় না।
এখানেও সময়টি গুরুত্বপূর্ন । আওয়ামী লীগ এতদিন পরে এখনই কেন জঙ্গিবাদের উত্থান চাইবে সেটাও বিবেচনাযোগ্য। আর তারা যদি বিএনপি, জামায়াত জোটের দোষ দিতেই চাইবে, তবে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নামে দায় স্বীকার করে কেন বিবৃতি দেয়া হবে ? এটাও একটি গভীর প্রশ্ন ।
তবে রাজনৈতিক প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা এভাবে নাকচ করে দেয়া গেলেও সরকার পরিচালনাকারী আওয়ামী লীগকে এজন্য কাটগড়ায় দাঁড়াতেই হবে । এর কারন , এখন পর্যন্ত তারা একটি ঘটনারও সুরাহা করতে পারেনি । তাদের জনপ্রিয়তা সংকট, ক্ষমতায় টিকে থাকার সহজ পথ এড়িয়ে গিয়ে ঘুরপথে ক্ষমতায় থাকার প্রবনতা তাদের সরকারকে অনেক দুর্বল করে দিয়েছে । যার ফলে যদি বাংলাদেশে নামকরা এসব জঙ্গি সংগঠন তাদের কর্মকান্ড চালিয়েও থাকে, সেটা প্রতিরোধ করার মত যথেষ্ট সক্ষমতা এই সরকারের আছে বলে মনে হয় না । তারপরে সরকারের মন্ত্রীরা এক একটা ঘটনার পর পরই যেভাবে প্রতিপক্ষকে
উদ্দেশ্য করে বক্তব্য দিতে থাকে তাতে করে প্রকৃত জঙ্গিদের পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বহুগুন বেড়ে যায়। নিহত দীপনের বাবা বলেছেন, বিষয়টি রাজনৈতিক সংকট । এই ভাবে চিন্তা করছে রাজনৈতিক সেই সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে ।
সন্দেহ নেই, এই ধরনের সংকট অবশ্যই বড় ধরনের জাতীয় ইস্যু । আর এসব ইস্যু মোকাবেলা করা পৃথিবীর কোনো সরকারের একক চেষ্টায় সম্ভব না । সম্ভব হলে সিরিয়ায় সংকট এতদিনে কমে আসতো । কিন্তু সেটা আরো বাড়ছে ।
আর এই জাতীয় সংকটের মোকাবেলায় সবগুলো রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি জাতীয় ঐক্যের আয়োজন করা জরুরী হয়ে পড়েছে । কিন্তু দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল সেই ঐক্যের প্রকৃয়া থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছে । তারপরের বাংলাদেশকে যারা জঙ্গিবাদে জর্জরিত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে না চান , তবে অচিরেই তাদের উচিত একটি জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়া ।
মিজানুর রহমান সুমন নিউজ এডিটর জনতার নিউজ২৪ ডটকম।