মাথায় জটা চুল আর হাতে গাজার কলকি রেখে উদ্ভট কথা বললেই লালনের দর্শন জানা যায় না। লালনের দর্শন জানতে চাইলে যেতে হয় আরেক দর্শনের গভীরে। লালন একটা ভিন্ন অধ্যায়। যেন আলাদা একটা দেশ, যেন আলাদা একটা ধর্ম। সেসব নিয়ে বিস্তর পড়ালেখা জরুরি। এদেশে লালনকে নিয়ে গবেষণা প্রচুর হয়েছে, এখনও হচ্ছে। লালনকে নিয়ে দেশ বিদেশের নানান […]
মাথায় জটা চুল আর হাতে গাজার কলকি রেখে উদ্ভট কথা বললেই লালনের দর্শন জানা যায় না। লালনের দর্শন জানতে চাইলে যেতে হয় আরেক দর্শনের গভীরে। লালন একটা ভিন্ন অধ্যায়। যেন আলাদা একটা দেশ, যেন আলাদা একটা ধর্ম। সেসব নিয়ে বিস্তর পড়ালেখা জরুরি। এদেশে লালনকে নিয়ে গবেষণা প্রচুর হয়েছে, এখনও হচ্ছে। লালনকে নিয়ে দেশ বিদেশের নানান জায়গায় গবেষণা হচ্ছে আজ। সেসব গবেষণায় ব্যস্ত বিশ্বের মেধাবী মানুষজন।
দেহতত্ত্ব, মানুষে মানুষে সমতা, সকল বিভেদ এর অবসান, স্রষ্টার কাছে ফিরে গিয়ে একাত্মতা লাভ, তাঁরা জন্মান্তরে বিশ্বাসী, একটি মায়া (ক্রোধ, হিংসা, লোভ, কাম) থেকে মুক্ত জীবন যাপনের মাধ্যমে তারা জন্মান্তরের ধারা থেকে মুক্তি পেয়ে স্রষ্টার সাথে মিলিত হয়ে যেতে চান। আর তারাই বাউল। আর এই বাউলদের শিরোমণি সাইজি লালন।
লালনের কতিপয় দর্শন ও রীতি
১. চারচন্দ্র ভেদতত্ত্ব : শুক্র, রজঃ, বিষ্ঠা ও মূত্র। অমাবস্যা ও পূর্ণিমা যোগে বাউলগণ প্রকৃতি আশ্রয়ী হয়ে সাধনা করতে গিয়ে পানক্রিয়া অনুষ্ঠান করে থাকেন । বাউল গবেষক ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য লালনশাহ তথা বাউল সম্প্রদায়ের ধর্মমত সম্পর্কে বলেন, ‘বাউলগণ পুরুষদের বীজরূপী সত্তাকে ঈশ্বর বলেন। বাউলদের মতে এই বীজ সত্তা বা ঈশ্বর রস ভোক্তা, লীলাময় ও কাম ক্রিড়াশীল’। এজন্য তাদেরকে অনেকে বীজেশ্বরবাদী বলে অভিহিত করে থাকেন। বাউলদের এ দর্শন ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
২. মনের মানুষতত্ত্ব : বাউলগণ আল্লাহ, অচিনপাখী, মনেরমানুষ, আলোকসাঁই ইত্যাদিকে সমার্থবোধক মনে করে থাকেন। আত্মসন্ধানের মাধ্যমে তাদের এই কথিত ‘মনেরমানুষ’ তথা খোদাকে সন্ধানই তাদের প্রধান লক্ষ্য। তাদের কথিত ‘মনেরমানুষ’ এর কী অর্থ তা নিয়ে বাউল গবেষকদের মধ্যে প্রচুর মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য মুহাম্মাদ। কেউ বলেন আল্লাহ উদ্দেশ্য। এভাবে বাউলগণ আল্লাহর পরিচয়কে অস্পষ্ট করে ফেলেছে বলে ইসলাম ধর্মের চিন্তাবিদগণের মতামত।
আহাদে আহমাদ নাম হয়ে জগতে,
আত্মতত্ত্বে ফাজিল যে জনা,
জানতে পায় নিগুঢ় কারখানা,
হল রাসূল রূপে প্রকাশ রব্বানা।
অন্যত্র লালন তার মুর্শিদকে লক্ষ্য করে বলেন,
আপনি খোদা
আপনি নবী
আপনি সেই আদম ছবি
অনন্তরূপ ধরে ধারণ
কে বোঝে তার নিরাকারণ
নিরাকার হাকীম নিরঞ্জন
মুর্শিদরূপ ভজন পথে।
বাউলগণ ‘ফানাফিল্লার’ যুক্তি দেখিয়ে তাদের এই দর্শন প্রমাণ করার চেষ্টা করে থাকেন। এছাড়াও সংসার বিমুখ হওয়া, ওহীভিত্তিক কোনো ধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থা অস্বীকার করা, সঙ্গীত সাধনার মতবাদ লালন করা লালন ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ।ফলে এটা বলাই যায় যে তারা আলাদা গোত্রেরই অংশ। তবে কয়জন আজ মেনে চলছে লালনের আদর্শ ও দর্শন, সেটা বড় প্রশ্নই বটে।
আব্দুল্লাহ আল মোহনের গবেষণায় এসেছে – লালন তাঁর অসংখ্য গানের মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধ আত্মার অনুসন্ধান করেছেন, তার গানে ও ভাবাদর্শে সুফিবাদের ভাবধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ‘আপনার আপনি চেনা যদি যায়।/ তবে তারে চিনতে পারি/ সেই পরিচয়।’ আর তাই আত্মশুদ্ধির জন্য লালনের গানের কোন বিকল্প নেই। আমাদের আত্মশুদ্ধির এক অনন্য শিক্ষক লালন।
স্বাভাবিক পথচলার কথা তিনি তার গানের মধ্য দিয়ে শিখিয়েছেন। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ দূর করতে হলে মেশিনগান দিয়ে নয়, গান দিয়ে করতে হবে। এক্ষেত্রে সর্বোত্তম অস্ত্র হতে পারে লালনের গান। তাই লালনের গান ধরে রাখার গুরুত্ব অসীম। কারণ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমরা সংগ্রাম করে চলেছি। এ সংগ্রামের সহায়ক হতে পারেন লালন ফকির। শুধু বিনোদনের জন্য লালনের গান নয়, এ গান আলোকিত হওয়ার জন্য। লালনের গান সত্য সুন্দরকে সদা খুঁজে ফেরে।
ফকির লালন শাহ তাঁর গানের বাণীর ভেতর দিয়ে একটি সুসংবদ্ধ জীবন বিধানের নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর গান এক গভীর দ্যোতনায় এই বিশ্ব-সংসার, মানবধর্ম, ঈশ্বর, ইহলৌকিক ও পারলৌকিকতা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে বাধ্য করে। লালন ফকির নির্দিষ্ট কোনো ধর্মমত বা জাতপাত ও বর্ণে বিশ্বাস করতেন না; বরং সকল ধর্মের সমন্বিত ধর্মীয় মতবাদই তাঁর গানে প্রচারিত হয়েছে। লালন সমন্বিত ধর্মীয় মতাদর্শের মধ্য দিয়ে মানবধর্মকেই বড় করে দেখেছেন।
লালনের গান গভীর নির্জন পথে মনের মানুষকে খুঁজে ফেরার গান। তিনি ছিলেন দেহবাদী আধ্যাত্মিক সাধক। ভক্তিবাদ তার সাধনার আশ্রয়। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন আধুনিক মনের মানুষ। তাই বস্তুবাদ তার দর্শনের স্বভাব। আর তার দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তিনি যুক্তিবাদের আশ্রয় নিয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক সকল ধর্মেই ঈশ্বর বা আল্লাহ এবং সেই অদেখা সত্তার প্রতি পূজা অর্চনা ও প্রার্থনা এক স্বাভাবিক ব্যাপার এবং সেই অধর সত্তাই সকল কিছুর নিয়ন্ত্রা। কিন্তু লালনের যুক্তিবাদে তা অনেকটা ‘খেল্লো’। তিনি বলেছেন অধর সত্তা মানুষকে সৃষ্টি করেননি বরং মানুষই তাকে সৃষ্টি করেছেন।
‘আল্লাহ হরি ভজন পূজন
সকলই মানুষের সৃজন
আচানক অচিনাই কখন ।
জ্ঞান ইন্দ্রিয় না সম্ভবে ॥
সপ্তদশ শতকে আবির্ভূত বাউল দর্শনকে জনপ্রিয় করেন লালন শাহ৷ ধর্মীয় সহনশীলতার কথা সমৃদ্ধ তাঁর গানগুলো অনেক কবি ও গুনিজনের জন্য ছিল উৎসাহমূলক৷ হিন্দুবাদ ও সুফিবাদের মিশ্রণ বাউল দর্শনের মূল কথা হলো মানবতা৷