মাঈনুল ইসলাম নাসিম : জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণেও তারে দিতে এলে না ফুল ! কি নির্মম ! বড় বেশি লজ্জাস্কর। হাঁ, ডাক্তার ভাইয়ের কথাই বলছিলেন নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশীরা। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির মহান মুক্তি সংগ্রাম যে ভিনদেশী মানুষটির হৃদয়ে প্রোথিত করেছিল লাল-সবুজের ভালোবাসা, টানা ৩৬ বছর বাংলাদেশের মানুষকে শতভাগ নিঃস্বার্থ সেবা দেয়া সেই […]
মাঈনুল ইসলাম নাসিম : জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণেও তারে দিতে এলে না ফুল ! কি নির্মম ! বড় বেশি লজ্জাস্কর। হাঁ, ডাক্তার ভাইয়ের কথাই বলছিলেন নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশীরা।
১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির মহান মুক্তি সংগ্রাম যে ভিনদেশী মানুষটির হৃদয়ে প্রোথিত করেছিল লাল-সবুজের ভালোবাসা, টানা ৩৬ বছর বাংলাদেশের মানুষকে শতভাগ নিঃস্বার্থ সেবা দেয়া সেই ডা. এড্রিক বেকারের মহাপ্রয়াণে শোক প্রকাশ করার সৌভাগ্য হয়নি বঙ্গবন্ধু কন্যা তথা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। বাংলাদেশকে ভালো লেগে এবং বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবেসে যিনি তাঁর জন্মভূমির চাইতেও বেশি অনুভব করতেন পদ্মা-মেঘনা-যমুনা তীরের বাংলাদেশকে, সেই ডাক্তার ভাই আজ শুধুই ইতিহাস।
বছরের পর বছর ধরে সুদূর নিউজিল্যান্ড থেকে ফান্ড এনে যিনি মধুপুরের প্রত্যন্ত গ্রামকে আলোকিত করেছেন হতদরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে, তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে পারতেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও। হতাশাজনক হলেও সত্য, না সরকার প্রধান না রাষ্ট্রপ্রধান কেউই শোক প্রকাশ করেননি। যদি করতেন তবে গনভবন-বঙ্গভবন সর্বত্রই জ্বলে উঠতো দায়িত্ববোধের আলো, পতপত করে উড়তো বিবেকবোধের নিশান, এমনটাই মনে করছেন নিউজিল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশীরা। রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কারো তরফ থেকে ডাক্তার ভাইয়ের সমাধিতে পুষ্পস্তবকও অর্পিত না হওয়ায় অনেকটা ক্ষোভও প্রকাশ করা হয়েছে ওয়েলিংটন, ডুনেডিন, ক্রাইস্টচার্চ ও অকল্যান্ডের বাংলাদেশ কমিউনিটিতে।
ড. এড্রিক বেকারের খুব কাছের বন্ধুদের দু’জন এই প্রতিবেদককে আক্ষেপ করেই বললেন, “ডাক্তার ভাই যেহেতু মৃত্যুর আগে বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধই তাঁকে স্থায়ীভাবে টেনে এনেছিল বাংলাদেশে, পাশাপাশি দরিদ্র মানুষদের নিঃস্বার্থ সেবাদানের যে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তাতে করে যৌক্তিক কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রীয় সম্মান ও মর্যাদা অনায়াসে পেতে পারতেন তিনি”। অকল্যান্ড প্রবাসী ডা. মোহাম্মদ ইসলাম শাখু জানান, “ডাক্তার ভাইয়ের যুগান্তকারী কর্মযজ্ঞ নোবেল কমিটির কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নিচ্ছিলাম আমরা, কিন্তু সেই সম্মানের আগেই কিছুটা অসময়ে চলে গেলেন তিনি”। গরীবের এই ডাক্তারকে বাংলাদেশ সম্মান না করায় রাজধানী ওয়েলিংটনের বাংলাদেশী গুণীজনেরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেন, টাঙ্গাইলে ডাক্তার ভাইয়ের শেষকৃত্যে যেখানে যোগ দিতে পারতের স্বয়ং রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী, সেখানে সামান্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীরও সময় হয়নি কাইলাকুড়ির মাটিতে পা ফেলার।
১৯৭৭ সাল থেকে নিউজিল্যান্ডে বসবাস করছেন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট আতাউর রহমান জেপি (জাস্টিস অব পিস)। অন্যদিকে ডা. এড্রিক বেকার বাংলাদেশের অধিবাসী ১৯৭৯ সাল থেকে। বহু বছরের ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব ছিল দু’জনের। বাংলাদেশী অধ্যুষিত অকল্যান্ডে অনারারি কনসাল জেনারেলের দায়িত্বে থাকা আতাউর রহমান খুব দুঃখ পেয়েছেন ডাক্তার ভাইয়ের মতো একজন জাতীয় বীরের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শিত না হওয়ায়। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, “কিছুদিন আগে তিনি আমাকে বলছিলেন, আমার শরীরটা দিনেদিনে খারাপ হয়ে যাচ্ছে, জানিনা আর কতোদিন ‘আমার’ বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকতে পারবো”। ডা. এড্রিক বেকারের মহাপ্রয়ানে বাংলাদেশ তাঁর সোনার সন্তানকে হারালো, এমনটাই মনে করেন অনারারি কনসাল।
এদিকে টাঙ্গাইল মধুপুরের কাইলাকুড়িতে চিরনিদ্রায় শায়িত ‘বাংলাদেশের নাগরিক’ ডা. এড্রিক বেকারকে যত দ্রুত সম্ভব মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরষ্কারে ভূষিত করার আহবান জানিয়েছেন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন নিউজিল্যান্ড ইনকর্পোরেটেড (বানজি)’র প্রেসিডেন্ট ড. আনোয়ার জাবেদ এবং বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি’র প্রেসিডেন্ট ড. দাউদ আহমেদ। নেতৃবৃন্দ এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে বলেন, “ডাক্তার ভাই আরো ২০-২৫ বছর আগেই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব যেমন পেতে পারতেন তেমনি তাঁর জীবদ্দশাতেই যদি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেতেন তবে বাংলাদেশই সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হতো বিশ্ব দরবারে, একইসাথে স্বার্থক হতো আমাদের দেশপ্রেম”।