Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ nobodharanews

বাংলাদেশি সংবাদ
৫:৩৯ এএম, ১০ আগস্ট ২০২১

মন্দিরে হামলা ঠেকানোয় প্রশাসনের তৎপরতা প্রশ্নবিদ্ধ

খুলনার রূপসা উপজেলার শিয়ালী গ্রামে মন্দির ও বেশ কিছু বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। একটি বাদানুবাদকে কেন্দ্র করে এই হামলা হয়। সন্ধ্যার সেই বাদানুবাদের পর রাতেই একদফা নিষ্পত্তি হয়, রবিবার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই সহস্রাধিক মানুষ লাঠি, রামদা নিয়ে হামলা চালায়। রূপসা উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও […]

মন্দিরে হামলা ঠেকানোয় প্রশাসনের তৎপরতা প্রশ্নবিদ্ধ
৫ মিনিটে পড়ুন |

খুলনার রূপসা উপজেলার শিয়ালী গ্রামে মন্দির ও বেশ কিছু বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। একটি বাদানুবাদকে কেন্দ্র করে এই হামলা হয়।

সন্ধ্যার সেই বাদানুবাদের পর রাতেই একদফা নিষ্পত্তি হয়, রবিবার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই সহস্রাধিক মানুষ লাঠি, রামদা নিয়ে হামলা চালায়।

রূপসা উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বাদী শক্তিপদ বসু বলেন, ‌‘শনিবার সকাল থেকেই আমরা গ্রামে বেশ কিছু বাইরের লোক দেখতে পাই। তাদের সন্দেহ হলে আমরা জেলার স্পেশাল ব্রাঞ্চকে (ডিএসবি) খবর দেই।’

‘পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকেও জানানো হয়। ডিএসবির একজন ওসি এসেছিলেন। অনেকক্ষণ ছিলেন। তিনি দুপুরে লাঞ্চে যাওয়ার পরপরই দুই দিক দিয়ে এই মামলা করা হয়। শিয়ালী বাজারের পুলিশ ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের প্রতিরোধ করার চেষ্টাও করেন। কিন্তু সংখ্যায় তারা এত বেশি ছিল যে, ৬/৭ জন পুলিশ সামাল দিতে পারেনি। তবে পুলিশের সংখ্যা বেশি থাকলে এই হামলা ঠেকানো যেতো বলেই আমি মনে করি।’

শুক্রবার সন্ধ্যায় হিন্দু অধ্যুষিত শিয়ালী গ্রামের কয়েকজন কীর্তণ করতে করতে বাজারের পাশে শ্মশান মন্দিরে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে শিয়ালী জামে মসজিদের কাছে পৌঁছলে মসজিদ থেকে বের হয়ে ইমাম মাওলানা নাজিম উদ্দিন তাদের মসজিদের পাশে ঢাক-ঢোল বাজাতে নিষেধ করেন। এ নিয়ে ইমামের সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজনের বাদানুবাদ হয়। এক পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দ্রুত পুলিশ উপস্থিত হলে এবং স্থানীয় মুরুব্বিরা মিমাংসা করে দিলে যে যার মতো বাড়ি ফিরে যান।

খবর পেয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সাধন অধিকারী রাত ১১টার দিকে মসজিদে যান। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে মসজিদে গিয়ে ইমাম সাহেবকে বলেছি, বাবা তুমি আমার ছেলের বয়সি। যা হওয়ার হয়েছে। ওসি সাহেব বলেছেন, রবিবার আমরা সবাই একসঙ্গে বসে মিটিয়ে নেবো। তোমার মনে কোনো রাগ রেখো না।’

এরপর প্রশাসনও তৎপর ছিল। কিন্তু প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নদীর কূল দিয়ে এসে তারা প্রথমে শ্মশান মন্দিরে, পরে অন্যদের বাড়ি-ঘরে হামলা চালায়। আমি চেয়ারম্যান হিসেবে যা করা দরকার ছিল, সেই চেষ্টা আমি করেছি। কিন্তু তারপরও এই হামলা ঠেকানো যায়নি।’

কী ঘটেছিল সেদিন জানতে চাইলে মসজিদের ইমাম মাওলানা নাজিম উদ্দিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘শুক্রবার রাতে এশার নামাজের সময় মসজিদের বাইরে তারা ঢাক-ঢোল বাজাতে বাজাতে যাচ্ছিল। আমি বাইরে গিয়ে তাদের এগুলো বাজাতে নিষেধ করি।’

আমি তাদের বলি, আমরা কী আপনাদের মন্দিরের সামনে গিয়ে আযান দেই, ঢাক-ঢোল বাজাই? এ নিয়ে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে একজন আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এরপর মুরুব্বিরা এসে সমাধান করে দেন। পরে ওসি এসেছিলেন, তাকে আমি বিষয়টি বলেছি। পরে কী হয়েছে তা আর আমি জানি না।’

তবে শক্তিপদ বসু মনে করেন, ইমাম নাজিম উদ্দিন সঠিক তথ্য না দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার কারণে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, ‘কেউ তাকে ধাক্কা দেয়নি। তিনি আসলে মিথ্য কথা বলেছেন। এর আগে তিনি যেসব মসজিদে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেও এই ধরনের ঝামেলা বাধিয়েছেন। তার কারণেই মূলত এখানে সাম্প্রদায়িক যে সম্প্রীতি ছিল সেটা নষ্ট হয়েছে।’

কারা হামলা চালিয়েছে জানতে চাইলে শক্তিপদ বসু বলেন, ‘শেখপুরা, বামনডাঙ্গা এবং চাঁদপুর এলাকার লোকজন এসে এই হামলা করেছে। এদের উষ্কানি দিয়েছে স্থানীয় কিছু মানুষ। চাঁদপুর গ্রামের ৯৯ ভাগই জামায়াত-বিএনপির সমর্থক। হামলাকারীদের অনেককেই চেনা গেছে। তাদের নামে মামলাও করা হয়েছে।’

শনিবার বিকেল ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত পুরো গ্রামে তাণ্ডব চালানো হয় বলে ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন শিবপদ ধর। তার বাড়ির ঘরের টিনগুলো রাম দা দিয়ে কুপিয়েছে হামলাকারীরা। ঘরে থাকা দেড় লক্ষাধিক টাকা আর ৬ ভরি স্বর্ণালঙ্কারও তারা নিয়ে গেছে।

শিবপদ বলেন, ‘গ্রামের ৫টি মন্দির, ৬টি দোকান এবং ২টি বাড়িতে হামলা করা হয়েছে। ওরা হামলার সময় আমাকে খুঁজছিল, পেলে হয়ত মেরে ফেলতো। একাত্তরের পর আমাদের গ্রামে আর এমন হামলা হয়নি। ওরা আমার বাবার সমাধি পর্যন্ত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আমরা বারবার প্রশাসনকে জানিয়েছি, কিন্তু তারা আসার আগেই ওরা চলে গেছে।’

হামলায় শিয়ালী পূর্বপাড়া হরি মন্দির, শিয়ালী পূর্বপাড়া দূর্গা মন্দির এবং শিবপদ ধরের গোবিন্দ মন্দিরে রক্ষিত সকল প্রতিমা ভাংচুর করা হয়। হামলাকারীরা বলাই মল্লিকের দোকান ও বাড়ী, অনির্বান হীরার চায়ের দোকান, প্রিতম মজুমদারের মেশিনারিজের দোকান, গনেশ মল্লিকের ওষুষধের দোকান, শ্রীবাস মল্লিকএবং সৌরভ মল্লিকের মুদির দোকান ভাংচুর করে।

শনিবারের এই হামলার ঘটনায় শক্তিপদ বসু বাদী হয়ে ২৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২০০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ এজাহারনামায় ১০ জনসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

রূপসা থানার ওসি সরদার মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ঘটনাস্থলের পাশেই একটি পুলিশ ক্যাম্প রয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে তৎপর ছিলাম। কিন্তু মানববন্ধন করার নাম করে তারা এই হামলা করেছে। যদিও আমরা মানবন্ধনের অনুমতি দেইনি। ঘটনার পরপরই আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া ফুটেজ দেখে অভিযান শুরু করেছি। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছি।’

পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করেছে তাদের মধ্যে আছেন, রূপসার ঘাটভোগ ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামের শরিফুল ইসলাম (৪০) ও সম্রাট মোল্লা (২৪), শিয়ালী গ্রামের মঞ্জুরুল আলম (৪২), বামনডাঙ্গা গ্রামের শরিফুল ইসলাম শেখ (৩০), রানা শেখ (২২), মোমিনুল ইসলাম (২৮), মোল্লাহাট উপজেলার বুড়িগাংনী গ্রামের আকরাম ফকির (৪০), সোহেল শেখ (২০), শামীম শেখ (২২), জামিল বিশ্বাস (২৪) ও কাজী এমদাদ হোসেন (৪৫)। তবে মামলার প্রধান আসামী নাজিম সমাদ্দার (১৯) ও মাসুম মল্লিককে (২৫) এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের বর্তমান তৎপরতায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে শক্তিপদ বসু বলেন, ‘‘প্রশাসনের এই তৎপরতা আগে থেকে থাকলে এই ঘটনাটি এড়ানো যেতো।”

এদিকে সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থলে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী। সেখানে তিনি সমাবেশও করেছেন। তবে শক্তিপদ বসু বলেন, ‘‘এমপি সাহেব ওনার প্রোটোকল নিয়ে এসে ঘুরে গেছেন। আমাদের ডাকেননি। আমি মামলার বাদী আমার সঙ্গে উনি কথাও বলেননি। এমনকি আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের এখানে যারা নেতা আছেন, তাদের কাউকেই ডাকেননি।”

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সালাম মুর্শেদী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘আমি সেখানে ক্ষতিগ্রস্থদের বাড়িতে গেছি। আমি তো কাউকে ডাকিনি, সবাই সেখানে ছিলেন। আমি উপজেলা চেয়ারম্যানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি করেছি ক্ষতিগ্রস্থদের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে সেটা নির্ধারণ করতে।’

‘আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের ক্ষতিপূরণ দেবো। আমি চাই এই ঘটনার সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের যে ক্ষতিটা হয়ে গেল, হিন্দু অধ্যুষিত রূপসায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে সুনামটা ছিল, সেটা আর থাকলো না।’

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর

সিডনিতে শতশিখায় উজ্জ্বল ঢাবি
৫ বছর আগে
অস্ট্রেলিয়ান সংবাদ
প্রাণ হাতে নিয়ে ইউরোপ!
৫ বছর আগে
অস্ট্রেলিয়ান সংবাদ

Advertise with us
Advertise with us
আরও nobodharanews সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com