নাইম আবদুল্লাহ: পহেলা বৈশাখ বাঙ্গালী জাতির প্রাণের উৎসব। এদিন থেকেই শুরু হয় বাংলা সনের গণনা। বাঙ্গালী তার নিজস্ব জাতি সত্ত্বার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য যতগুলো উৎসব পালন করে তার মধ্যে বৈশাখ বরণ অন্যতম । বৈশাখ বরণের সাথে যে অনুষ্ঠানটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত তা হল বাঙ্গালীর ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। বৈশাখী মেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যাত্রা, […]
নাইম আবদুল্লাহ: পহেলা বৈশাখ বাঙ্গালী জাতির প্রাণের উৎসব। এদিন থেকেই শুরু হয় বাংলা সনের গণনা। বাঙ্গালী তার নিজস্ব জাতি সত্ত্বার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য যতগুলো উৎসব পালন করে তার মধ্যে বৈশাখ বরণ অন্যতম । বৈশাখ বরণের সাথে যে অনুষ্ঠানটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত তা হল বাঙ্গালীর ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা।
বৈশাখী মেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যাত্রা, পুতুল নাচ, নাগরদোলা, জারি-সারি, গম্ভীরা কীর্তন, পালার আসর, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, লাঠি ও হাডুডু খেলার কথা। সেই সাথে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগসূত্র।
গত ১১ই এপ্রিল শনিবার বঙ্গবন্ধু পরিষদ সিডনি অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগে টেম্পি পার্কে অনুষ্ঠিত হোল অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙালী কমিউনিটির প্রানের মেলা, ঐতিহ্যবাহী “বৈশাখী মেলা”।সিডনির এই বৈশাখী মেলা যেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙ্গালী ও অন্যান্য ভাষা-ভাষীদের এক মহামিলন মেলা। এটা ছিল বঙ্গবন্ধু পরিষদ সিডনি অস্ট্রেলিয়ার ৯ম বৈশাখী মেলা।
এবারেরমেলাপ্রাঙ্গণদর্শক-অতিথিতে ছিলকানায়কানায়পূর্ন।শুধু অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙ্গালীরাইনয়, অন্যান্যভাষা-ভাষীরঅতিথিদেরউপস্থিতিওছিলউল্লেখযোগ্য।
সিডনিরদূর দূরান্ত ছাড়াও ক্যানবেরা, মেলবোর্ন থেকেও মেলায় অগনিত দর্শকদের সমাগম ঘটে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে্য অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে প্রবীনরাও বৈশাখী সাজে সজ্জিত হয়ে অংশগ্রহণ করেন এ মেলাতে। মেলা প্রাঙ্গণে মুখরোচক দেশীয় খাবার নিয়ে পাটি বিছিয়ে অনেককে খেতে দেখা যায়। “মেরিকভিলের টেম্পি রিজার্ভ নয়, এ যেন এক বাংলা মায়ের কোল”!
অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেয়া ও বেড়ে ওঠা বাঙালী প্রজন্মকে জাতির ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও এর ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়াই এই মেলার প্রধান উদ্দেশ্য।
ঐতিহ্যবাহী এই “বৈশাখী মেলা” প্রাঙ্গণে চারিদিক ঘিরে ছিল বাঙালী খাবার ও দেশীয় পোশাকের নানাবিধ স্টল। খাবারের স্টলগুলিতে ছিল নানা ধরনের মুখরোচক দেশীয় খাবার পুরি, চটপটি, পিয়াজু, হালিম, জিলাপি, সিঙ্গারা বিরানি, রকমারি পিঠা ও মিষ্টি। আর তৈরি পোশাকের স্টল গুলিতে ছিল সালোয়ার কামিজ, জামদানি ও অন্যান্য তাঁতের শাড়ির বিপুল সমাহার। মেলায় বিভিন্ন রকমের রাইড বড় দর্শকদের যেমন গ্রাম্য নাগরদোলার স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছে তেমনি ছোট ছোট বাচ্চাদের সারা-বেলা আনন্দে মাতিয়ে রেখেছে।এ মেলায় নামাজের জন্য তৈরী করা হয়েছিল আলাদা প্যান্ডেল।
এ ছাড়াও বৈশাখী মেলার উম্মুক্ত মঞ্চে ছিল শিশু কিশোর শিল্পীদের অংশগ্রহণে দেশাত্মবোধক গান, ছড়া, কবিতা, নাচ ও খণ্ড নাটকের সুবিশাল আয়োজন। বিকেল ৩টা ৩০মিনিটে কমিউনিটি বাংলা স্কুলের ক্ষুদে শিল্পীদের একক ও দলীয় মনোরম নৃত্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করা হয়। ক্ষুদে শিল্পীদের নৃত্যে পুরো মেলা প্রাঙ্গণে ছিল মুহূর্মুহু করতালি। এরপর কবিতা আবৃত্তি পর্বে অংশগ্রহণ করেন ড. কাইয়ুম পারভেজ ও শাহীন শাহনেওয়াজ। এ পর্বের উপস্থাপনায় ছিলেন মুনা মুস্তফা।
বিকেল ৫ ঘটিকায় শুরু হয় অতিথিদের আসন গ্রহন ও আলোচনা পর্ব। গামা আবদুল কদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈশাখী মেলার আলোচনা সভা উপস্থাপনা করেন সিরাজুল হক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হাই কমিশনার কাজী ইমতিয়াজ হোসেন।মেলায় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিত ছিলেন, ফেডারেল পার্লামেন্ট মেম্বার ম্যাট থিসউয়েট, নিউ সাউথ ওয়েলস এর বিরোধী দলীয় নেতা লিনডা বারনি, ল্যাকাম্বা আসন থেকে রাজ্য সরকার নির্বাচনে নবনির্বাচিত এমপি জিহাদ দিব, ক্যানটারবেরি সিটি কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র ও কাউন্সিলর কার্ল সালেহ, ম্যারিকভিল সিটি কাউন্সিলের মেয়র মার্ক গাওয়ার, ম্যারিকভিল সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলর মরিস হান্না, স্যাম ইস্কান্দার, সাইদ ইস্কান্দার, স্ক্রিস উড, স্টেইথফিল্ড সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলর রাজ দত্ত ও অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাই কমিশনের অনারারী কনসুলার অ্যান্থনি খৌরী।
মাগরিবের নামাজের বিরতির পর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০ টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলে মূল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অংশগ্রহণ করেন যথাক্রমে আলিফা নোতা, ও ঐকতান। বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠান সুর ও ছন্দে অংশগ্রহন করেন রিতা করিম, পিয়াসা বড়ুয়া, অভিজিত বড়ুয়া, ডঃ ফারজানা ইউসুফ লিটা, অমিয়া মতিন। নাচের অপূর্ব ঝংকারে মাতিয়ে রাখেন অর্পিতা সোম।
সবশেষে স্থানীয় ব্যান্ড কৃষ্টি ও স্পর্শ তাদের গান পরিবেশন করে মেলার দর্শকদের সুরের মূর্ছনায় মাতিয়ে রাখে।
এছাড়াও মেলায় উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশী রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ, সিডনি থেকে প্রকাশিত অনলাইন ও পেপার পত্রিকার সম্পাদক ও সাংবাদিকবৃন্দ, লেখক, সাহিত্যিক, কবি ও সুশীল সমাজসহ সর্বস্তরের প্রবাসী বাংলাদেশীরা।
মেলার আয়োজকরা গত নয় বছর ধরে ম্যারিকভিল সিটি কাউন্সিলের সার্বিক সহযোগিতার কথা গভীর কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। মেলা কমিটির আহ্বায়ক গাউসুল আজম শাহাজাদা সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞটা ও ধন্যবাদ জানিয়ে মেলার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
মেলায় পার্কিং এর ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল। অনেক দর্শকদের পার্কিং না পেয়ে বাসায় ফিরে যেতে দেখা গেছে। দর্শকরা আগামী বছরের মেলায় ম্যারিকভিল সিটি কাউন্সিলের কাছে অতিরিক্ত পার্কিং এর ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য মেলার আয়োজকদের প্রতি অনুরোধ করেছেন।