বিশেষ প্রতিবেদন:নবধারা নিউজ
গতকাল ১৮ এপ্রিল (শনিবার ) সিডনি অলিম্পিক পার্কের টেনিস সেন্টারের পতিত জায়গায় অনুষ্ঠিত হল বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়া আয়োজিত বাংলাদেশী কমিউনিটির বৃহৎ বৈশাখী মেলা নামের অপসংস্কৃতির বাণিজ্যিক মেলা।
প্রবাসের কর্মব্যস্ততা এবং জীবন সংগ্রামে সবাই হাঁপিয়ে উঠি। বিদেশি সংস্কৃতির মধ্যে হাবুডুবু খেতে খেতে নিজস্ব শেকড় সন্ধানের মধ্যে কিছুটা আত্মতৃপ্তি খুঁজে ফিরি। আমাদের আগামী ও নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে
তুলে ধরার জন্য বড় মাধ্যম এই পহেলা বৈশাখ। ছেলে-মেয়েদেরকে বলা হয়, এটা তোমার পিতৃপুরুষের আদি উৎসব। বাঙ্গালী তার নিজস্ব জাতি সত্ত্বার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য যতগুলো উৎসব পালন করে তার মধ্যে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা অন্যতম।
এই ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলাকে বর্তমানে একটি মহল তাদের নিজস্ব ব্যবসা ও অপসংস্কৃতিতে পরিণত করছে। বৈশাখী মেলায় চলছে ইংরেজী গান, চায়নিজ ও এ্যাবোরজিনাল নৃত্য, বাঙ্গালীর ঐতিহ্যের নাম ভাংগিয়ে চালাচ্ছে নিজস্ব বাণিজ্য।
আজ থেকে ২২ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম এই বৈশাখী মেলার শুভসূচনা করেছিল সাবেক ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গাজী রুহুল হক উজ্জল, সিরাজুল হক, গামা আব্দুল কাদের, মিজানুর রহমান তরুনসহ অন্যান্যরা।
১৯৯৬-৯৭ অর্থ বছরে এই সংস্থাকে ১৫,০০০/ ডলার অনুদান প্রদান করা হয়। এই অনুদানের টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার না করে তছরুপ করায় ১২ বছর পর ২০০৭ সালে ফেরার ট্রেডিং থেকে ৫০,০০০/ ডলার জরিমানা করে বঙ্গবন্ধু পরিষদকে
নোটিশ প্রদান করা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের রেজিস্টেশন বাতিল হয়ে যায়। ২০০৯ সালে ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদের’ পরিবর্তে নতুন নামে ‘বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়া’ গঠন করে বৈশাখী মেলা পরিচালনা করে আসছে। বঙ্গবন্ধু পরিষদ এবং
পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়া এই বৈশাখী মেলা নামের বাণিজ্যিক মেলাটি গত ১০ বছর ধরে উদযাপিত করে সিডনি অলিম্পিক পার্কের অ্যাথলেটিক সেন্টারের বিশাল মাঠে। এ ভ্যানুটি ছিল রেলস্টেশন ও কার পার্কিংএর সন্নিকটে,ফলে
দর্শকদের তেমন ঝামেলা পোহাতে হয়নি। এবারের মেলার ভ্যানু ছিল রেলস্টেশন থেকে অনেক দূরে অবস্থিত টেনিস সেন্টার প্রাংগনে। নির্দিষ্ট কোন সাইন না থাকাতে রেলস্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে আসা দর্শকদের পোহাতে হয়েছে অনেক দূর্ভোগ।
এছাড়াও এ মেলা প্রাংগনে জায়গা ছিল খুবই অপ্রতুল এবং ছিলনা কোন সবুজ ঘাস। টেনিস সেন্টারের বাইরের পতিত জায়গায় ছিল মেলার স্টল। মনে হয়নি এটা বৈশাখী মেলা। মেলায় আগত দর্শকদের ছিল হাজারো অভিযোগ। অনেকে
বলেছেন এটা মনে হয় সানডে মার্কেট, অনেকে বলেছেন এটা ফেলেমিংটন মার্কেট। নূতন ও আগামী প্রজন্মদের নিয়ে মেলায় আগমন ও ঢুকতে গিয়ে যত বিপত্তির শুরু। পার্কিং আর টিকেট যেন সোনার হরিণ। ট্রেনে করে মেলা স্থানে পৌঁছালেও
সেই একই বিপত্তি। গাড়ী পার্ক করে কিংবা ট্রেনে থেকে নেমে মেলা প্রাঙ্গনে পৌছাতে প্রায় ৪০ মিনিট লেগে যায়। তারপর লাইন ধরে টিকেট কাটতে চলে যায় আরও ৪০ মিনিট। এই ৮০ মিনিটের হিসেব নিয়ে মেলার আয়োজকদের কোন মাথা
ব্যাথা ছিল না। মেলায় ঢোকার পর বিগত বছরগুলোর মতো চারিদিকে সবুজ ঘাসের কোন আধিক্য ছিলনা। ভিতরে ঢুকে মনে হয়েছে প্যাডিংটনের সানডে মার্কেট। ভিতরে ছিল খুব ছোট পরিসরে টেনিসকোর্ট। প্রচন্ড কান ফাটানো শব্দে ছোটছোট
ছেলে মেয়েরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক দর্শক এই প্রতিবেদককে বলেছেন, অলিম্পিক পার্কের টেনিস সেন্টার শুধুমাত্র ইনডোর অনুষ্ঠানের জন্য। এখানে বৈশাখী মেলার মতো বিশাল আয়োজন কিভাবে করলো তা বুঝতে পারছি না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব বলেন, মেলার আয়োজক কমিটি সব সময় নিজেদের বড়ত্ব দেখাতে এবং মেলায় টিকেট বেঁচে আর স্টল বসিয়ে ডলার উপার্জনের জন্য এতটাই ব্যাস্ত থাকে যে মানসম্মত অনুষ্ঠানের
দিকে তাদের কোন নজর থাকে না। আসলে কমিউনিটির কাজে কোন মুনাফা করবে না বলেও তারা শুধু মাত্র নিজেদের কৃষ্টি ও দেশীয়সংস্কৃতি তুলে ধরার ছত্র ছায়ায় ব্যবসা করে চলেছে এরা। এই ভ্যানু পরিবর্তন করে পূর্বের অ্যাথলেটিক সেন্টারের
বিশাল মাঠে পরবর্তী মেলার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সিডনির অন্যান্য বৈশাখী মেলা, লোক মেলা, ফাগুন মেলা ও বিজয় মেলায় কোন প্রবেশ টিকেট না থাকায় দর্শকরা অতি সহজেই মেলায় প্রবেশ করতে পারেন। কমন ওয়েলথ ব্যাংক, এএনজেড ব্যাংক মানি গ্রাম, ওয়েষ্ট ইউনিয়ান সহ সব বড়
বড় প্রতিষ্ঠান থেকে স্পনসর পাওয়ার পরও এই মেলায় প্রবেশ ফি ৭ ডলার করায় এবং দর্শকদের তুলনায় টিকেট কাউন্টির কম থাকায় হাজার হাজার দর্শকদেরকে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সময়
শেষ হয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত শত শত মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মেলায় প্রবেশ করতে পারেননি। অনলাইন টিকেট সিস্টেম এবং বাংলাদেশী গ্রোসারী গুলোতে পূর্ব থেকে টিকেট প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছেন ভূক্তভোগী দর্শককগন।
এইবারের মেলায় প্রতিবারের মতো লেবার ও লিবারেল পার্টির বহু শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদগণ উপস্থিত ছিলেন। আরও উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন শহরের মেয়র ও কাউন্সিলরগন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি এবোট এর
বিশেষ প্রতিনিধি ফিলিপ রাডোক, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাই কমিশনার কাজী ইমতিয়াজ হোসেন, নিউ সাউথ ওয়েলস প্রিমিয়ারের প্রতিনিধি রে উইলিয়াম এমপি, শেডো মিনিস্টার ফর সিটিজেনশিপ মিশেল রোল্যান্ড এমপি, ম্যাট থ্রিসটিথেওয়েইট
এমপি, ফেডারেল মেম্বার ফর পার্যাম্যাটা জুলি অওেন্স এমপি, সিডনি অলিম্পিক পার্কের সহ মহা ব্যবস্থাপক জন ফারগুসন, এস্টেট মেম্বার ফর ব্ল্যাকটাউন জন রবার্টসন এমপি, এস্টেট মেম্বার ফর ল্যাকাম্বা জিহাদ দিব এমপি, এস্টেট মেম্বার ফর
স্টেটফিল্ড যডি মাকেয় এমপি, সিডনিতে নেপালের কন্সুলার জেনারেল দীপক কুমার খাদকা, এসবিএস নিউজের প্রতিনিধি মিস ম্যানডি উইক্স প্রমুখ।
দুপুর ৩. ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়া মেলার উদ্বোধন ঘোষণা করেন। তারপর লাকেম্বা বাংলা স্কুলের ছোট সোনামণিরা মধুর কলম্বন পরিবেশন করে। বাংলা নাচের স্কুলের শিশু কিশোররা নিক্কন পরিবশন করে। বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল
অস্ট্রেলিয়া আয়োজনে পরিবেশিত হয় কবিতা পাঠের আসর রুদ্রপলাশের পদাবলী। ছোট্ট মনি সাঞ্জানা ও সামারা পায়েল নৃত্য পরিবশন করে। দ্বৈত কণ্ঠে রাব্বি ও সাকিনা শেষ বিকেলের সুর গেয়ে শোনান।
ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলায় পরিবেশিত হয় ইংরেজি গান, চাইনিজ গান, চায়নিজ ও এ্যাবোরজিনাল নৃত্য। এ দৃশ্যে পুরো দর্শকরা ছিল হতবাক। সঙ্গিতাঞ্জলিতে পরিবেশিত হয় স্থানীয় শিল্পীদের গান। এ পর্বে প্রথমে সংগীত পরিবেশন করেন
বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী বীর মুক্তিযাদ্ধা মিজনুর রহমান তরুন। প্রায়াত সংগীত শিল্পী আব্দুল আলীমের জনপ্রিয় সংগীত সর্বনাসা পদ্মা নদী এবং হলুদিয়া পাখী সোনারী বরন পাখী টি ছাড়িল কে এই গান নিয়ে মন্চে আসেন শিল্পী রুহুল আমিন।
এসময় পুরো দর্শক গ্যালারিতে ছিল মুহূর্মুহু করতালি।
বাংলা লোকসংগীতের তালে তালে একক ও দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন অর্পিতা সোম ও তার দল। এটি ছিল এই বৈশাখী মেলার চমৎকার দৃষ্টি নন্দন দৃশ্য। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিল তানিশা ও তারিক। বঙ্গবন্ধু কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়া আয়োজিত
বঙ্গবন্ধু এওয়ার্ড দেয়া হয়। তারপর ব্যান্ড শোঁ পরিবেশন করেন দি ক্রু। পথ প্রোডাকশন তাদের বর্ণাঢ্য ফ্যাশন শোঁ প্রদর্শন করেন। বৈশাখী মেলায় দর্শকদের প্রধান আকর্ষণ নায়ক আলমগীর তনয়া শিল্পী আঁখি আলমগীর সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য
মন্চে উঠার সাথে সাথে শুরু হয় প্রবল বর্ষন। মন্চে এবং দর্শকদের জন্য বৃষ্টি প্রতিরোধ শেড না থাকায় তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করতে পারেননি।
অলিম্পিক পার্কের বৈশাখী সম্পর্কে বাংলাদেশী কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অভিমত ও অভিযোগ:
—————————–
অলিম্পিক পার্কের বৈশাখী সম্পর্কে সামাজিক মিডিয়ায় চলছে প্রতিবাদের ঝড়। এছাড়াও বাংলাদেশী কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অভিমত ও অভিযোগ প্রকাশ করেছেন-
বাংলাদেশ আস্ট্রেলিয়া ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সভাপতি মোহাম্মেদ মতিউর রহমান খান বলেন, সিডনির বাংগালির প্রানের মেলা বৈশাখী মেলা, আজ ১৮/০৪/২০১৫ইং, ১৪২২
বাংলা সালের বৈশাখী মেলা অলিম্পিক পার্কে অনুষ্ঠিত হলো, আজকের মেলায় আমি এবং পরিচিত সকল বাংলাদেশী মেলাপ্রিয় মানুষ প্রচন্ডভাবে আহত। এ যেন একদল অভিজ্ঞ মানুষের হাতে একটি পরিপূর্ন অনুষ্ঠানের সমাধি হলো।
আজকের মেলায় কোনকিছুই আগের কোনবারের সাথে তুলনা করার মত ছিলনা। টিকিটের লম্বা লাইনে মানুষের কষ্টের শুরু, ভ্যানু পরিবর্তনেরও কোন উপযুক্ত প্রচার বা দিকনির্দশনা ছিলনা। ষ্টেজের অনুষ্ঠান সামনের নিচের কয়েক সারির
লোকেরাই দেখতে পেরেছেন, বাকিরা কারো চেহারা দেখতে পাননি।
বিশিষ্ট লেখক আজয় দাস গুপ্ত, বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ নিউ সাউথ ওয়েলস এর সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ কাইয়ূম, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাহফুজ চৌধুরী, লাকেম্বা বাংলা স্কুলের পরিচালক ও লেবার পার্টির নেতা জামিল হোসেনসহ
কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবারের মেলা সম্পর্কে হতাশ প্রকাশ করেছেন। আগামী বছরের মেলায় আয়োজকদেরকে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।