গতকাল দুপুরে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ট্রফি’তে হাত দিয়ে মহেন্দ্র সিং ধোনী, লাসিথ মালিঙ্গার ফটো সেশনকে ঘিরে সে এক অন্য উত্তেজনা। ট্রফি হাতে দু’অধিনায়কের হাসি গতকাল, আজ সেই ট্রফি উঁচু করে প্রাণভরে হাসবেন, অন্যজন মুষড়ে পড়বেন হতাশায়। ট্রফির লড়াইয়ে ১৬ থেকে কমতে কমতে এখন দু’টি দল, অবশিষ্ট মাত্র একটি হার্ডল, শিরোপা যুদ্ধ। ১৬ মার্চে যে […]
গতকাল দুপুরে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ট্রফি’তে হাত দিয়ে মহেন্দ্র সিং ধোনী, লাসিথ মালিঙ্গার ফটো সেশনকে ঘিরে সে এক অন্য উত্তেজনা। ট্রফি হাতে দু’অধিনায়কের হাসি গতকাল, আজ সেই ট্রফি উঁচু করে প্রাণভরে হাসবেন, অন্যজন মুষড়ে পড়বেন হতাশায়। ট্রফির লড়াইয়ে ১৬ থেকে কমতে কমতে এখন দু’টি দল, অবশিষ্ট মাত্র একটি হার্ডল, শিরোপা যুদ্ধ। ১৬ মার্চে যে উত্তেজনা দিয়ে শুরু আসর, আইসিসি’র মেগা আসর টি-২০ বিশ্বকাপের ট্রফি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় তা। টি-২০ বিশ্বকাপে তৃতীয়বারের মতো অল এশিয়ান ফাইনাল, সেই তৃতীয়টি আবার এশিয়ার ক্রিকেট ক্রেজ জাতি হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে। ভারতই হোক, কিংবা শ্রীলংকা- শিরোপা তো অন্ততঃ থাকতে পারছে আর একবার এশিয়ায়। স্বাগতিক দলের ব্যর্থতার মাঝেও যে বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রেমীদের সুখানুভূতির উপলক্ষ এখানেই।
সংক্ষিপ্ত সংস্করণে ক্রিকেট বিশ্বকাপের প্রথম শিরোপা ভারতের, ৭ বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রফি জয়ের স্বপ্ন। ২০০৭ টি-২০ বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ে ইতিহাস যিনি, সেই অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনীর সামনে আর একটি ইতিহাসের হাতছানি। রোবটের মতো হয়েও তাই লক্ষ্য পূরনের এতো কাছে এসে রোমাঞ্চিত ধোনী- ‘২০০৭ টি-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের স্মৃতি মনে করা কঠিন। আমি শুধু বলতে পারি সেই দলটার মতো এখনকারটাও বিশ্বকাপ নিয়ে খুবই রোমাঞ্চিত।’ ক্রিকেটের কোন আসরে এক অধিনায়কের আইসিসি’র পর পর তিন তিনটি মেগা আসরের ট্রফি জয়ের অতীত নেই, টি-২০ বিশ্বকাপের ট্রফি জিতলেই নতুন ইতিহাসেও অনন্য হয়ে থাকবেন ধোনী। ২০১১ বিশ্বকাপের পর, ২০১৩’র চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শিরোপা জিতে ভারতকে আনন্দে ভাসানো ধোনীর সামনে এমন কিছুর হাতছানি, তবে প্রাপ্তির খাতায় এতোসব নিয়ে নয়, ভাবনা ধোনীর শুধুই আর একটি ট্রফি, এবং তা টি-২০ বিশ্বকাপ। আইপিএল কেলেংকারিতে প্রাণ ওষ্ঠাগতপ্রায় তার, নিজের এমন দুঃসময়কে ঢেকে দিতে পারে একটাই, তা ট্রফি। সে কারণেই দেশের হয়ে টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ই তার ভাবনায় পাচ্ছে গুরুত্ব- ‘আমাদের কাছে ফাইনালে ভালো করাটা জরুরি। অন্যান্য ব্যাপার নিয়ে আসলে আমরা ভাবছি না। কারণ পরিসংখ্যানে মনোযোগ দেয়ার চেয়ে দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জেতাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ রোমাঞ্চিত।’ তার জন্য টীমমেটদের সবার কাছ থেকে সেরাটা আদায় করার দিকেই বরং বেশি মনোযোগ দিতে চান ভারত অধিনায়ক- ‘এ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বোলার বা ব্যাটসম্যান হিসেবে যেই সুযোগ পাবে সে যেন নিজের সেরাটা দিতে পারে। ফাইনাল জিতলে কি হবে সেই ভাবনা পরে।’
নিকট অতীতে আইসিসি’র মেগা আসরে ফাইনাল ট্র্যাজেডি বরণ করতে হয়েছে শ্রীলংকাকে চার চার বার, ২০০৩ এবং ২০১১ বিশ্বকাপ এবং ২০০৯ এবং ২০১৩ টি-২০ বিশ্বকাপে। ফাইনালে বার বার পর্যদুস্ত হবার সেই অতীতও মাথায় রাখতে হচ্ছে শ্রীলংকাকে। ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মালিঙ্গা অবশ্য অতীত ভুলে নতুন ইতিহাস সৃষ্টির কথা ভাবছেন- ‘যে কেউ জিততে পারে। যে কম ভুল করবে, সে-ই জিতবে ট্রফি। আমরা কম ভুল করে ফাইনাল জিততে চাই।’
টানা ৩ মাস বাংলাদেশে অবস্থান করছে শ্রীলংকা, আবহাওয়া, কন্ডিশন এবং উইকেটের সঙ্গে দারুণ মানিয়ে বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে শ্রীলংকার। বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট, ওয়ানডে, টি-২০ সিরিজ জিতে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া দলটি বাংলাদেশের মাটি থেকে প্রথমবারের মতো জিতেছে এশিয়া কাপের ট্রফি। টি-২০’র ফাইনালকে সামনে রেখে এসব সুখস্মৃতিও উজ্জীবিত করছে আর একটি ট্রফি জয়ে, সেটাই মনে করছেন মালিঙ্গা- ‘বাংলাদেশে আমরা প্রচুর ক্রিকেট খেলছি। এখানে দলের সবাই শতভাগ দেয়ার চেষ্টা করছে। আমরা এশিয়া কাপ জিতেছি, আগামীকাল (আজ) নিজেদের প্রমাণ করার আরেকটা সুযোগ। প্রত্যেকেরই আমাদের উপর আস্থা আছে। এখানকার কন্ডিশন ও উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ায় আমাদের ভালো সুযোগ রয়েছে।’
আইসিসি’র মেগা আসরে ফাইনাল ট্র্যাজেডি বার বার যাদের, মনস্তাত্ত্বিকভাবে সেখানেই ভারতকে রাখছে এগিয়ে। তবে টি-২০ ক্রিকেট বলে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটা মাথায় আনতে চাইছেন না ধোনী- ‘আমার মনে হয় না টি-২০ তে মনস্তাত্ত্বিক কোন সুবিধা কাজে লাগে। কারণ ভালো দলগুলোর মধ্যে এখানে ব্যবধানটা খুবই সামান্য। নির্দিষ্ট দিনে যারা ভালো করবে জিতবে তারাই। আমি পরিসংখ্যানে তেমন বিশ্বাস করি না। তাই মাঠে নেমে এ টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত যেমন খেলেছি সেটি পুনরাবৃত্তি করতে পারলেই আমাদের সুযোগ থাকবে। গত দুই-তিন বছরে আমরা রান তাড়া করে জেতার মতো ভালো একটি দলে পরিণত হয়েছি। সবকিছু নির্ভর করবে আপনি কিভাবে বল বা ব্যাট করবেন সেটির উপর।’ প্রস্তুতি ম্যাচে ভারতকে হারিয়েছে শ্রীলংকা, এখানেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে এগিয়ে থাকার কোন কারণ দেখছেন না মালিঙ্গা- ‘প্রস্তুতি ম্যাচ আসলে প্রস্তুতি ম্যাচই। টুর্নামেন্টের ম্যাচ আলাদা। সেটা মানসিক এবং শারীরিকভাবেও। ফাইনাল একটি বড় ম্যাচ, ভাবনাটাও এখানে সম্পূর্ণ আলাদা। যারা ভালো খেলবে শিরোপা জিতবে তারাই।’
আজ টি-২০ আসরটির পর্দা নেমে যাওয়ার করুণ সুর বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দুই শ্রীলংকান গ্রেটের টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও যাচ্ছে শেষ হয়ে। ঘোষণা দিয়ে টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানাতে এসেছেন মাহেলা, সাঙ্গাকারা। আইসিসি’র চার চারটি মেগা ইভেন্টে ফাইনাল ট্র্যাজেডির শিকার এই দুই গ্রেটকে সংক্ষিপ্ত ভার্সনের ক্রিকেটে বিদায়ী উপহার হিসেবে শিরোপা উপহার দিতে চান মালিঙ্গা- ‘শুধু শ্রীলংকা নয়, পুরো ক্রিকেটবিশ্বেরই কিংবদন্তি। আমি দু’জনের অধীনেই খেলেছি, এখন তারা খেলছে আমার অধীনে। এই পরিস্থিতিটা নিয়ে আমি বেশ আনন্দিত। কারণ দলের তরুণ ক্রিকেটারদের ওরা সবসময়ই দারুণ সাহায্য করে। এই দু’জনের জন্য আমরা নিজেদের সেরাটা দিতে চাই। আগামীকাল (আজ) বিশেষ এক দিন এবং আমাদেরও বিশেষ কিছু করতে হবে।’
ব্যাটিংয়ে কোহলী, রোহিতদের সঙ্গে বোলিংয়ে আশউইন, মিশ্রা-ভারতের প্রধান অস্ত্র। সেখানে শ্রীলংকার সমর পরিকল্পনা ঘিরে থাকছে অল রাউন্ডার ম্যাথুউজ, টপ অর্ডার কৌশল সিলভা, পেস বোলিংয়ে মালিঙ্গা এবং স্পিনে হেরাথ। ব্যাটিং স্তম্ভ সাঙ্গাকারা ও মাহেলাকে রাখতে হচ্ছে সঙ্গে। তবে এমন এক ম্যাচকে সামনে রেখে অপরাজিত দল ভারত অধিনায়ক ধোনীর দর্শন আবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ, আর চাপমুক্ত খেলার তত্ত্বে বিশ্বাসী সেখানে মালিঙ্গা।
– See more at: http://www.dailyinqilab.com/2014/04/06/170971.php#sthash.B2y35b4E.dpuf