Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ nobodharanews

অস্ট্রেলিয়ান সংবাদ
১২:৩১ পিএম, ৩১ অক্টোবর ২০১৪

দশ পয়সার আবেদন(গল্প নয়)

।। আজাদ আলম ।। রাহুল, আমি বিকেল চারটার আগেই চলে আসব, তোমার ঠিকানাটা এসএমএস করে দাও। জি আচ্ছা আঙ্কেল, এক্ষুনি দিচ্ছি। মিনিট দশেক পরে রাহুলের ফোন। আঙ্কেল সরি, কেন জানি আমার ফোন থেকে এসএমএস যাচ্ছে না, আমার ঠিকানাটা একদম সোজা, কাইন্ডলি একটু লিখে নেন। আমার বাসা থেকে তার বাসা ৯ কিলোমিটার। কুইন ভিক্টোরিয়া স্ট্রীট, কোগারা। […]

দশ পয়সার আবেদন(গল্প নয়)
১০ মিনিটে পড়ুন |
।। আজাদ আলম ।।
রাহুল, আমি বিকেল চারটার আগেই চলে আসব, তোমার ঠিকানাটা এসএমএস করে দাও।
জি আচ্ছা আঙ্কেল, এক্ষুনি দিচ্ছি। মিনিট দশেক পরে রাহুলের ফোন।
আঙ্কেল সরি, কেন জানি আমার ফোন থেকে এসএমএস যাচ্ছে না, আমার ঠিকানাটা একদম সোজা, কাইন্ডলি একটু লিখে নেন।
আমার বাসা থেকে তার বাসা ৯ কিলোমিটার। কুইন ভিক্টোরিয়া স্ট্রীট, কোগারা। গাড়ি থেকে নেমে বাসার নম্বর খুঁজছিলাম। আমার জিপিএস ওর দেয়া নাম্বার ধরছিল না, তাই এই খোঁজা। এর মধ্যে রাহুলের ফোন, আঙ্কেল আপনাকে আমি দেখতে পাচ্ছি, পেছন ফিরে তাকান।
আমার ইতি উতি তাকানো দেখেই ও বুঝতে পেরেছে আমিই সেই আগন্তুক।
কর্নার রাস্তার সাইড গেটে দাঁড়িয়ে যে ছেলেটা সেই রাহুল। ফর্সা লম্বা লিকলিকে হাসিমুখ চেহারার ছেলেটির গত চারটি বছরের বহুমুখী যুদ্ধের কথা না জানলে কেউই বিশ্বাস করতে চাইবে না মরণ রোগের সাথে তার যে বিরতিহীন বসবাস চলছে।
রাহুলের রোগের নাম “একিউট লিম্ফ ব্লাস্টিক লিউকোমিয়া”। ব্লাড ক্যান্সার পরিবারের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সদস্য এই মরণ ব্যাধি। চিটাগাং জেলার মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারে জন্ম রাহুলের। বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে এই সুদূরে পাড়ি দিয়েছিল লেখাপড়া করে মাইগ্রেশন নিয়ে থেকে যেতে। আশা ছিল, মাইগ্রেশন পেলে বাবা মায়ের অনেক স্বপনই পূরণ করতে পারবে সে। একমাত্র ছোট বোনের, বাবা মায়ের সমস্ত দায়িত্ব নিশ্চিন্তে বইতে পারবে। ভর্তি হয়েছিল ডিপ্লোমা ইন ফাইন্যান্সে। ভর্তির ৬ মাস পরেই ধরা পরে এই দুরারোগ্য রোগটি। এর পর থেকে ঝরে পরতে থাকে ২২/২৩ বছরের সতেজ যুবকটির জীবনের সবুজ পাতাগুলো একের পর এক।
দোতালা বাসা। টাউন হাউস স্টাইলের বেশ পুরোনো। সাধারনতঃ এই স্টাইলের কমার্সিয়াল এরিয়ার বাসাগুলোর নীচটা দোকান এবং উপরটা রেসিডেন্সিয়াল হিসেবে ব্যবহার হয়। রাহুল থাকে নীচ তলায়। দুই তলা মিলে ওরা দশ জন থাকে । সবাই বাংলাদেশের ছাত্র। রাহুলের ঘর দিয়েই উপরে যেতে হয়। বলতে গেলে, ওর থাকার জায়গা মিলেছে করিডোরে। একটা ছোট টেবিল, চেয়ার এক পাশে আর অন্যপাশে ওর সিঙ্গেল বিছানা। মাঝ খানের সরু পথ দিয়ে উপরে বা অন্য রুমে যেতে হয়। সংগতঃ কারণেই ও নীচে থাকে। তার হাউস মেটরা যে কতবার ওকে হাসপাতালে নিয়েছে, কতবার যে এ্যাম্বুলেন্স এসেছে তার হিসেব সে নিজেও মনে করতে পারে না।
আমার অনুরোধেই ও বলতে শুরু করলো তার প্রবাসের জীবন কাহিনী।
“ আমার লাইফ স্টোরি কি শুনবেন আঙ্কেল বরং আমি আমার মরণ কাহিনী শোনাই। এই যে আমাকে দেখছেন, যে করেই হোক কথা বলতে পারছি, আপনার প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা করছি। দিস ইজ মাই রেয়ার লাইভলি মোমেন্ট। বেশির ভাগ সময় আমি মরণের সাথে বসবাস করি। ডাক্তার আমাকে ছয় ছয় বার ডেড ঘোষণা করেছিলেন। আই ওয়াজ ক্লিনিকালি ডেড সিক্স টাইমস। আমার ক্যান্সার স্টেজ দুই থেকে চারে ছিল অনেকদিন। যে স্টেজ থেকে ফিরে আসে না কেউ। আমার সাথে হাসপাতালে যারা ছিলেন এ রকম রোগ নিয়ে, তাদের ৯০ ভাগ আর বেঁচে নেই। এ দেশের সরকার, তাদের স্বচ্ছল পরিবার তাদের বাঁচানোর জন্য কত চেষ্টা করেছে, বেশুমার অর্থ যুগিয়েছে অথচ বাঁচাতে পারে নি। আর এই আমি পরিবারহীন, ম্যাডিকেয়ারবিহীন, সহায় সম্বলহীন, যে এখন এদেশের অপাংক্তেয় গলগ্রহ, চিকিৎসার বা ওষুধের রেগুলার যোগান দিতে পারি না, তাকে বিধাতা কি কারণে বাচিঁয়ে রেখেছেন, সেই জানেন।”
এই প্রথম আমি রাহুলের গলায় বেদনার স্বর শুনলাম। মাথা হেট হয়ে গেছে তার অজান্তেই।যাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তাঁরা আকাশের দিকে নিস্পলক তাকিয়ে থাকে অথবা এমনি মাথা হেট করে মাটির গভীরে গন্তব্য স্থল খোঁজে। দুহাতের পাতা দিয়ে মুখটা ঢেকে চার আঙ্গুল দিয়ে চোখের পানি মুছতে চেষ্টা করছে রাহুল।
‘আঙ্কেল, আমার চোখ দিয়ে আর পানি ঝরে না, ক্যান্সারে সব ওয়াটার সেল গুলো খেয়ে ফেলেছে। চোখের গরম জলে আর গাল ভিজে না আঙ্কেল। নাক দিয়ে কিছু সর্দি জল পরে এই যা।”
রাহুলকে সান্ত্বনা দেয়ার মত কোন ভাষা খুঁজে পাই নি আমি। তার ন্যুব্জ শরীরটার দিকে অপলক তাকিয়ে থেকেছি মাত্র। আমার নিজের পা দুটোও যেনো নীল বেদনায় বেদনার্ত। শক্তি ছিল না চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দেই। মনে হচ্ছিল, এ রকম স্বান্তনার অনেক অনেক গভীরে তার বেদনা, তার যন্ত্রণা, তার কষ্ট। আমার এ যৎসামান্য সহানুভূতি তার দুর্বিসহ নীল বেদনার গাড় রঙকে কতটুকুই বা হালকা করতে পারবে।
২০১০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে রাহুলের ডেথ স্টোরির শুরু। পরপর ৬ মাস ধরে মাসে ৭ টা করে কেমোথেরাপি নিতে হয় তার। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ টা ইন্ট্রাভেনাস কেমো নিতে হয়। এ সময় রাহুলের কোন মেডিকেয়ার নেই, ছিল মেডিব্যাঙ্ক প্রাইভেট যা তার জন্য ছিল বিরাট আশীর্বাদ। হসপিটালে থাকা কালীন চিকিৎসার ব্যয়ভার চালাচ্ছিল এই প্রাইভেট ফান্ডটি। হসপিটালের বাইরে থাকলে ওষুধ পত্রের সব খরচ তাকে নিজেই যোগার করতে হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছিল। ডাক্তার ডিক্লেয়ার দেয় তার ক্যান্সার শেষের স্টেজে। স্টেজ ৪ এ। শুধু কেমোথেরাপিতে আর কাজ হবে না। এলোজেনিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট দরকার। এর জন্য প্রয়োজন সুইটেবল ডোনার। ডোনারের বডি সেল তার সেলের সাথে ম্যাচ হওয়াটা হলো প্রথম শর্ত । রাহুলের ছোট বোন আসে ভাইকে বাঁচাতে। কিন্তু বিধি যার বামে আপন বোনের সেল স্যাক্রিফাইস তার কোন কাজে আসলো না। ম্যাচিং হলো ৮০ ভাগ। শত ভাগ না হলে হবে না। বাংলাদেশে ফিরে যায় ছোট বোন ভাইকে অসহায় ফেলে রেখে। এর মধ্যে রাহুলের জীবনে জীবন যাপনের যে আর এক আমূল পরিবর্তন এসেছে তা মুখ খুলে বলতে পারে নি তার ছোট বোনকে। রাহুল ধর্মান্তরিত হয়ে এখন রায়হান নামে অনেকের কাছে পরিচিত, সেই পরিচিতি বাবা মায়ের কাছে প্রকাশ হয়ে যাক, রাহুল সেটা চায় নি। ভয়, যদি মা বাবা তাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে, বাবা মা যে মঙ্গল দেবীর কাছে তার আশু রোগ মুক্তি কামনা করছে নিরন্তর, সেটা যদি বন্দ করে দেয়। বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল ঈশ্বরের কৃপা সেটাও যদি বন্দ হয়ে যায় এই কারণে।
এক বছরের স্টুডেন্ট ভিসা শেষ হয় ২০১১ এর অগাস্টে। ডাক্তারের সুপারিশে, তার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে ইমিগ্রেসশন অফিস রাহুলকে ম্যাডিকেল ভিসার আওতায় নিয়ে আসে। এ ভিসা ক্যাটাগরিতে সে অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে পারবে তবে চিকিৎসার খরচ তার নিজেকেই বহন করতে হবে। ম্যাডিব্যাঙ্ক প্রাইভেট ম্যাডিকেল খরচ বন্দ করে দেয় বছরের শেষের দিকে। এতদিনে রাহুলের ম্যাডিকেল বিল তিন লক্ষ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ম্যাডিব্যাঙ্ক এর সব ব্যয়ভার পরিশোধ করলেও তার হেলথ ইন্সুরেঞ্চ রিনিউ করতে অপারগতা জানায়। এর পর শুরু হয় রাহুলের ক্যান্সারের সাথে কঠিন বোঝাপড়া। সহৃদয় প্রবাসীদের সাহায্য এ রোগের খরচ যোগাতে হিমসিম খাচ্ছিল, যার ফলাফল দাঁড়ায় অনিয়মিত চিকিৎসা। দিনের পর দিন মরণ ব্যাধির সাথে এভাবে পাল্লা দিতে গিয়ে তার শরীরের ইমিউন সিস্টেম নেমে যেতে থাকে আশঙ্কা জনক ভাবে। সাধারণ সর্দি কাশি ভালো হতে যেখানে সময় নিত ৪/৫ দিন তা এখন ৪/৫ সপ্তাহেও সাড়ে না। ডায়াবেটিস বাসা বেধেছে জাঁকিয়ে। শরীরের হাড় ক্ষয়ে ক্ষয়ে হয়ে গেছে ৬০ বছরেরে বুড়োদের মত। প্রজনন ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়েছে ইতিমধ্যেই । হারিয়ে যাচ্ছে কথার খেই, হারাচ্ছে চিন্তা চেতনা, লোপ পাচ্ছে স্মৃতি শক্তি।
মেডিব্যাঙ্ক ইন্সুরেন্স রিনিউ না হওয়াতে ভিসা ডিপার্টমেন্ট ম্যাডিক্যাল ভিসা রিনিউ করে না। এত কিছুর মধ্যে ভিসার জন্য দৌড় ঝাঁপ এখানে ওখানে অনুরোধ করতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছে অনেক, অপাংক্তেয় বলে নাক সিটকিয়েছে এ দেশের অনেকে, হোপলেস কেইস বলে বিরুপ মন্তব্যও করেছে কেউ কেউ। কোন কিছুই রাহুলকে পরাস্ত করতে পারে নি মানসিক ভাবে। সাহসী রাহুলের সাহস, “এ জীবন যিনি দিয়েছেন তিনিই তো তো নিবেন যখন সময় হবে । ইন্ডিউচড কমা তে তো ছিলাম বেশ কয়েকবার। আবার তো চলা ফেরা করার শক্তি তিনি দিয়েছেন। তার উপর আমার শতভাগ ভরসা।”
২০১১ এর ডিসেম্বরে মেডিব্যাঙ্ক হাসপাতালের খরচ বন্দ করে দিলে, সেন্টজর্জ হাসপাতালের ডাক্তার সিন্ডিকেট নিজেদের অনুদানে তাকে হাসপাতালে রাখে প্রায় মাস দুয়েক। এই বদান্যতা রাহুল কখনই ভুলতে পারে না। এ ব্যবস্থা না হলে তাকে দেশে যেতে হত যার অর্থ দেশের বাড়িতে বাবা মায়ের চোখের সামনে ধুকে ধুকে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।
২০১১ থেকে ২০১২ তে পা ফেলে রাহুলের ক্যান্সার। জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি এ দুটো মাস ডাক্তারদের বদান্যতায় যেটুকু চিকিৎসা চলে সেটুকুই। নিয়মিত চিকিৎসা বন্ধপ্রায়। তার সাথে ভর্তি ক্যান্সার রোগীরা অনেকেই এখন পরপারে। ডাক্তাররা রাহুলকে নিয়ে কোন আশার আলো আর দেখছেন না। তার ক্যান্সারের অবস্থান স্টেজ চার থেকে দুয়ে নেমে এসেছিল মাঝখানে। নভেম্বর মাসে। বাঁচার ক্ষীণ আলো চোখের সামনে ঝিলিক মেরেছিল কিছুদিন। সেটুকই যা । ২০১২ এর মার্চ থেকে এখন সে রিফিউজি স্টেটাস নিয়ে কোন প্রকারে টিকে আছে এ দেশে। থাকার পারমিশনটুকুই শুধু। বাদবাকি ভরন পোষণ খরচ যাবতীয় তার নিজেকে যোগাড় করতে হয় নানা উপায়ে। বিরাট অংশ আসে ওয়েলফেয়ার গ্রুপ থেকে, আসে হৃদয়বান ব্যক্তি, পরিবার থেকে। এই রিফিউজি ভিসা তাকে প্রতি মাসেই রিনিউ করাতে হয়। এর জন্য যে কত কাঠ খড় পোড়াতে হয় সে ইতিহাস আর বলতে চাইলো না সে। এই মৃত্যু-প্রায় শরীর নিয়ে নানা ধরনের কাগজ পত্র যোগাড় করা, সেগুলো ল’ইয়ারের অফিস, ভিসা অফিস করতে করতে শরীরের শেষ শক্তিটুকু বেড়িয়ে যাবার মত। ক্যান্সারে নয়, রাস্তা চলতে গিয়ে ফ্যাটাল অ্যাকসিডেন্ট এ যে তার মরণ হয়নি সেও এক অলৌকিক আশীর্বাদ।
রায়হান কথাগুলো বলছিল ছাদের দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখ মেলে যেন চোখের কোন জল দু গন্ড বেয়ে চুইয়ে না পড়ে। রিফিউজি ভিসা তার, এ ভিসায় ম্যাডিকেল ট্রিটমেন্ট কভার করে না। সে সময় থেকে ওর দিন চলছে অনিশ্চিত, ট্রিটমেণ্ট চলছে কাদায় আটকে যাওয়া ঠেলাগাড়ির মত। কোন চ্যারিটি গ্রুপ অথবা কোন সহৃদয় ব্যাক্তি বা তার হাউস-মেট বা কোগারা মুছল্লার ভাইয়েরা হাত বাড়িয়ে ঠেলা দিলে তার জীবনের চাকা আবার চলতে থাকে।
২০১৩ তে তার ক্যান্সারের অবস্থান স্টেজ ৩ এ দাড়ায়। কেমোথেরাপি আর কাজ করছে না এখন। দুমাস/চার মাস অন্তর অন্তর কেমো নিয়ে কোন মতে বেঁচে আছে। ট্রান্সপ্লান্ট তার শেষ ভরসা। এ হলও ডাক্তারের শেষ কথা।
রাহুলের খবর আগেও লোকাল বাংলা পেপারে এসেছে “আকুল আবেদন” শিরোনামে। সাড়া দিয়েছে অনেকেই। এরজন্য সে কৃতার্থ। কৃতার্থ তার হাউসমেট এবং আশে পাশের ছাত্র ভাইদের কাছে, মুছল্লায় আসা সবার কাছে। তার সবসময় মনে হয় তাদের দোয়া, দয়া সাহায্য সহানুভুতিই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
রাহুল আর এগুতে পারলো না। ছাদের পানে চেয়ে থাকা দৃষ্টি নীচে নেমে আসল পুরোনো ক্ষয়ে যাওয়া কার্পেটের উপর। নিজের অক্ষমতাকে আর লুকিয়ে রাখতে পারলো না কোনভাবেই। অবশেষে দু’ গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পরলো বুকফাটা ফোঁটা ফোঁটা জল গুলো। বাস্পরুদ্ধ কণ্ঠটা গভীর থেকে গভীর বেদনার ভারে অবশ হতে থাকে। কোথায় পাবে চলার শক্তি, কোথায় পাবে চিকিৎসার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থকড়ি। কবে হবে শেষ এই করুণ কাহিনীর।
আমরা দুজনেই চুপচাপ। রাহুলের আহত চোখের ভাষাই এখন শব্দহীন কথাগুলো বলে চলেছে। এক মিনিট, দুই মিনিট, পাঁচ মিনিট চলে গেছে নীরব সংলাপে। চেয়ার ছেড়ে আমি রাহুলের পাশে বসে ঘাড়ে হাত রাখতেই ও কেঁদে উঠলো, আমি বাঁচতে চাই আঙ্কেল। জীবনের মায়া বড় মায়া, আঙ্কেল। আমার মায়ের কাছে, বাবার কাছে সুস্থ সবল হয়ে ফিরে যেতে চাই আমি। আমার জন্য দোয়া করবেন অনেক অনেক। আপনাদের দোয়াই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”
ঘন্টা দুয়েকের বেশি কোন দিক দিয়ে কেটে গেছে জানি না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আমি উঠলাম। রায়হান তখনও বিছানায় বসে আছে। ওর এক রুমমেট বাইরের থেকে এসে তার কুশলাদি জিজ্ঞেস করে উপরে চলে গেল। আমি তার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বললাম, রাহুল, এর ভিতর কিছু ডলার আছে যা আমার কাছের কিছু মানুষের থেকে পাওয়া। তোমার কথা শুনে তারা এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে আছে কিছু স্টুডেন্ট, একজন আন-এমপ্লয়ড মাদার, আছে মধ্যবিত্ত চাকুরীজীবির ভালবাসা এবং দোয়া। তোমার চিকিৎসার খরচের বহরে জানি এ সামান্য অর্থ। অথই সাগরে এক ফোঁটা জল ছাড়া কিছু না। পৃথিবিটা হৃদয়বান মানুষে ভর্তি। তোমার এ কাহিনী শুনে অনেকেই এগিয়ে আসবে এ প্রত্যাশা রাখি। এগিয়ে আসবে ফোঁটা ফোঁটা স্বচ্ছ সুশীতল জল হাতে নিয়ে। এই ফোঁটা ফোঁটা জলের সমন্বয় তোমার সাগর ভর্তি নোনা চোখের জল মুছে দিবে। তুমি শক্ত ছেলে, তোমার গাড়ির চাকা অনেক শক্ত। সব কাদামাটির বাধা পেরিয়ে স্বাভাবিক রাস্তায় উঠে আসুক এ আশা রাখি।
হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিলাম আমি। রায়হান বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করেও পারলো না। এক নাগাড়ে এতক্ষণ বসে থাকা, কথা বলা তার জন্য কষ্টদায়ক। গোধূলি বেলার নিস্তেজ সূর্যের মতই তার বিশ্রাম দরকার।
রাহুলের ঘর থেকে বেড়িয়ে গাড়িতে বসে আছি চুপচাপ। সন্ধ্যার শেষে রাত এগিয়ে আসছে। শনিবারের ছুটির রাত। উঠতি বয়সের কিছু যুবক যুবতী হৈ হুল্লোড় করতে করতে বারে ক্লাবে যাচ্ছে আনন্দ ফুর্তি করতে। রাহুলের বয়সীই হবে এরা। রাহুল শনি বা সোমবার, দিন বা রাতের মর্ম খুঁজে পায় না এখন। দিন আসে দিন যায়, রাত আসে চলে যায়। যেমন আসে তেমনি। রাহুলের বয়সী দুই বাংলাদেশি ছেলে মেয়ের আজ গায়ে হলুদ। ডালার পর ডালার পসরা নিয়ে যাচ্ছেন আত্নিয় স্বজন বন্ধু বান্ধবেরা পার্টি সেন্টারে। বিশাল ব্যাপক আয়োজন। সিডনিতে এখন পঞ্চাশ হাজারের বেশি বাংলাদেশি। এ রকম নানান ধরনের কর্মকান্ডে জড়িত আছেন, সজ্জিত থাকেন তাঁরা। যে কাজেই জড়িত থাকুন না কেন, যে সাজেই সেজে থাকুন না কেন, দেশের এবং দেশী মানুষের জন্য তাদের প্রাণ কাঁদবেই। খাঁটি বাঙ্গালীরা বাংলাদেশের পলি মাটির মত নরম মনের মানুষ। আমার এ আবেদন যদি অন্তত্ঃ ১০ ভাগ বাংলাদেশিদের কাছে পৌঁছায় এবং প্রতিদিন ১০ সেন্ট (পয়সা) করে রাহুলের সাহায্যের নামে জমায় তা হলে তার চিকিৎসার সিংহভাগের যোগাড় হবে অতি সহজেই। এ আমার বদ্ধমূল বিশ্বাস।
“রাহুল, তুমি সুস্বাস্থ্য ফিরে পাও।”
রাহুলের ব্যাঙ্ক একাউণ্ট এবং কন্টাক্ট নাম্বার
Rahul Baidya
BSB Number: 082-342
Account Number: 94-567-9331
National Australia Bank Limited (NAB)
NSW Australia.
Email: jico8016@hotmail.com
Mobile : (61)469422048
সৌজন্য:www.NoboDharaNews

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর

সিডনি প্রবাসীদের ঈদুল ফিতর উদযাপন
৩ বছর আগে
সিডনিতে স্মরণ সভা ও একুশের আলোচনা অনুষ্ঠিত
৩ বছর আগে
সিডনির সফল রেস্টুরেন্ট উদ্যোক্তা মিল্টন
৪ বছর আগে
সিডনিতে বাংলাদেশী ডেন্টিস্টদের মিলনমেলা
৪ বছর আগে
সিডনির ল্যাকাম্বায় বাণিজ্য মেলার আয়োজন
৪ বছর আগে

Advertise with us
Advertise with us
আরও nobodharanews সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com