Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ nobodharanews

আন্তর্জাতিক
৬:৩০ পিএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

প্রবাসে অন্তর্দহনে ছারখার হওয়ার একদিন

পরবাস জীবন চলছে তার নিয়মে; কোথাও কোন অনিয়ম নেই।প্রতিদিন একই সময় অফিসে যাওয়া, একই সময় বাসায় ফেরা, একই সময় ঘুমাতে যাওয়া, এ যেন রোবোটিক জীবন৷ কেউ একজন সব সেটআপ করে দিয়েছে আর আমি চলছি সেই নির্দেশনা অনুযায়ী। মাঝেমধ্যে এই জীবনটার প্রতি একঘেয়েমি চলে আসে। জীবনটা তুচ্ছ ও সামান্য মনে হয়৷ সবসময় একটা ভয় তাড়া করে […]

প্রবাসে অন্তর্দহনে ছারখার হওয়ার একদিন
নবধারা নিউজ অনলাইন
৭ মিনিটে পড়ুন |

পরবাস জীবন চলছে তার নিয়মে; কোথাও কোন অনিয়ম নেই।প্রতিদিন একই সময় অফিসে যাওয়া, একই সময় বাসায় ফেরা, একই সময় ঘুমাতে যাওয়া, এ যেন রোবোটিক জীবন৷ কেউ একজন সব সেটআপ করে দিয়েছে আর আমি চলছি সেই নির্দেশনা অনুযায়ী। মাঝেমধ্যে এই জীবনটার প্রতি একঘেয়েমি চলে আসে। জীবনটা তুচ্ছ ও সামান্য মনে হয়৷

সবসময় একটা ভয় তাড়া করে আমায়, কখন জানি এই জীবন থমকে যায়৷ কত মানুষই তো স্বপ্ন প্রত্যাশা নিয়ে ঘুমাতে যায়৷ সকালে তার নিস্তেজ দেহ আবিস্কৃত হয়৷ ঘুমের মধ্যেই সে স্বপ্নগুলো অপূর্ণ রেখে পরপারে পাড়ি জমায়৷ মাঝেমধ্যে জানতে খুব জানতে ইচ্ছে হয়। মানুষ কি সত্যি ঘুমের মধ্যে মারা যায়! অনেক মহান ব্যক্তিরা বলেন, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে জাগ্রত অবস্থায় দুনিয়ায় আনেন আবার জাগ্রত অবস্থাই দুনিয়া থেকে নিয়ে নেন।

মাঝেমধ্যে খুব অস্তিরতায় ভুগি। সৃষ্টিকর্তা এতকিছু শেয়ার করার ক্ষমতা দিলো অথচ জন্ম ও মৃত্যুর অনুভূতি কারো কাছে শেয়ার করার অধিকার দিলো না৷ একমাত্র জন্ম আর মৃত্যুর অভিজ্ঞতাই মানুষ কারো কাছে শেয়ার করতে পারে না৷

আচ্ছা মৃত্যু মানেই তো সব শেষ! এইতো কয়েকদিন শোক, সমালোচনা। তবে অনেকেই জীবিত অবস্থার চেয়ে মৃত্যু অবস্থায় বেশী শক্তিশালী হয়৷ তবে আমার মৃত্যুর কিছুদিন পর ওমর ফারুকী নামের কেউ একজন ছিল সবাই তা ভুলে যাবে৷ এটাই হয়ত প্রকৃতি নিয়ম। এই নিয়নের বাহিরে যাওয়ার সাধ্য কারো নেই।

এই তো কয়েকমাসে একজন প্রবাসীর কষ্টের সাক্ষী হয়েছিলাম৷ সেদিন আমার বন্ধের দিন ছিল, সারাদিন বাসায় থাকার পর বিকেলে বের হয়েছিলাম৷ সেদিনের বিকেলটা ছিল খুবই সুন্দর। পশ্চিমাকাশে সূর্য দিনের শেষ উত্তাপ ছড়িয়ে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে রক্তিম আকার ধারন করেছিল৷ সূর্যটাকে তখন বিশাল উত্তপ্ত প্লেট মনে হয়েছিল। কালো মেঘ এসে সূর্যকে আড়াল করে দিলে,আমি নির্বাক তাকিয়ে ছিলাম। এমন ক্ষমতা সম্পূর্ণ সূর্য যে সারাবিশ্বকে আলো দিয়ে প্রান বাঁচিয়ে রেখেছে, তাকে সামান্য মেঘখন্ড আড়াল করে দিলো!

আস্তে আস্তে মেঘটা সরে যায়৷ একঝাক নাম না জানা পাখি গোলাকার লাল সূর্যের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলাম ৷ কি যে দারুন দৃশ্য!

তখন রাস্তায় লোকগুলো ব্যস্তভাবে হেঁটে বাসায় ফিরছিল, এমন সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করার সময় কারো হাতে নেই৷ আসলে পেটে ক্ষুধা নিয়ে আর যাই হোক প্রকৃতি উপভোগ করা যায় না৷ কর্মক্লান্ত মানুষগুলোর মনে নিজের বাসস্থান ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সবাই যেন বাসায় ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেই প্রশান্তি পায়।

সেদিন অবসর না হলে প্রকৃতি এত কাছে হতে দেখা হতো না। প্রবাসে অবসর পাওয়াটা খুবই কঠিন৷ সপ্তাহে একদিন ছুটি থাকলেও অনেকেই ছুটি নেয় না। তার কারন ছুটির দিন কাজ করলে দ্বিগুন হাজিরা দেওয়া হয়৷ বাসায় বসে না থেকে যদি দ্বিগুন হাজিরা আসে, কে ছুটি নিয়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে চায়!!

কিছুক্ষণ প্রকৃতি উপভোগ করার পর আমিও ভিড়ের সাথে মিশে বাসার দিকে রওনা দিয়েছিলাম।

আমি আনমনে হাঁটছি হঠাৎ লক্ষ্য করি আমার সামনে একজন হাউমাউ করে কান্না করছে আর ধীরে ধীরে হাঁটছে৷ তার মুখের সামনে একটি মোবাইল কানের কাছে আরেকটি৷ এভাবে দুই হাতে দুই মোবাইল নিয়ে একজনকে কান্না করতে দেখে অবাক না হয়ে পারিনি৷ লোকটি আমার কাছাকাছি আসতেই তার চোখের পানি দেখে মন খারাপ হয়ে গেলো৷

আশ্চর্য লোকটির কান্না চোখের পানি কাউকে প্রভাবিত করল না। সবাই যার যার মত হেঁটে যাচ্ছিল৷ লোকটি সামনে এলে সবাই সরে তাকে যেতে রাস্তা করে দিয়েছিল। আসলে আমরা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকি তখন অন্যের দু:খ কষ্ট আমাদের প্রভাবিত করে না।

আমরা সবাই যার যার মতো করে হেঁটে যাচ্ছি অথচ কেউ জানলাম না কিংবা জানার চেষ্টা করছি না প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে তার ভেতরটা তছনছ হয়ে যাচ্ছে। আমি থমকে দাঁড়ালাম৷ তার কান্নার কারন জানার জন্য উদগ্রীব হলাম৷ আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে বলেছিলাম, ভাই এভাবে কান্না করছেন কেন? আমার উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি আমাকে জড়িয়ে হাউমাউখাউ করে কান্না শুরু করলেন৷

তার আচরনে আমি বিব্রত৷ একজন অচেনা অজানা লোককে জড়িয়ে কান্না করতে কাউকে এই প্রথম দেখলাম৷ হয়ত লোকটা কান্না করার জন্য অবলম্বন খুঁজছিল৷ আমাকে দেখে তার ভেতরের জমে থাকা লোনা জল একনিমিষে উপচে পড়তে লাগল।

লোকটিকে শান্তনা দিয়ে বললাম, ভাই কান্না করবেন না। আপনার কি হয়েছে বলা যাবে কি? তিনি আমার কাঁধ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বড় মোবাইলটি আমার হাতে দিলেন৷ মোবাইলের স্কিনে একটি পাঁচ কিংবা ছয় বয়সের ছেলের কাফনে মোড়ানো লাশ দেখে আঁতকে উঠলাম, মুহূর্তে আমার ছেলেদের কথা মনে পড়ে গেলো। বাচ্চা ছেলেটি আমার আপনের চেয়ে আপন হয়ে গেলো৷ এযেন আমারই সন্তান সাদা কাফন জড়িয়ে শুয়ে আছে৷ আমি নিজেকে স্থির রাখতে পারলাম না৷ বুঝতে পারলাম এটা তারই সন্তান, লোকটা এতক্ষণ সন্তান হারানোর কষ্টে এভাবে কান্না করছিল।

আমি তার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখতে পেলাম। এমন কোমল শিশুর লাশ দেখার পর আর কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না। পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টকর দৃশ্য হলো সাদা কাফনে জড়ানো সন্তানের লাশ দেখা৷

ভাইকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে বসিয়ে পরিচয় জানতে চাইলাম৷ ভাই কান্নাজড়িত কন্ঠে তার কথা বলতে লাগলেন৷

আমার নাম ফরিদ (কাল্পনিক) । দেশের বাড়ি কুমিল্লা। আমি বিয়ে করে সিঙ্গাপুর চলে আসি৷ বিয়ের পর আমার সন্তান হচ্ছিল না৷ এই নিয়ে দু:খের দহনে পুড়ছিলাম। এরপর তিনি থেমে গেলেন৷ আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখি তার দু’চোখ গড়িয়ে লোনা জল ঝরছে৷ সে কিছুটা সময় নিয়ে জামার হাতায় চোখের জল মুছে বলতে আরম্ভ করল৷ সন্তান হচ্ছিল না মানে আমার দুটি সন্তান জন্মের পরপর মারা যায়৷ প্রথম সন্তান গর্ভে আসার দুইমাস পর গর্ভেই নষ্ট হয়ে যায়৷

দ্বিতীয় সন্তানটি জীবিত অবস্থায় দুনিয়ায় এলেও মৃত্যু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল৷ জন্মের পরই তার নিউমিনিয়া ধরা পড়ে৷ সাথে সাথে ডাক্তাররা তাকে আইসিও তে ভর্তি করে৷ তখন আমি দেশে গিয়েছিলাম৷ বউ আমাকে দেখে অসহায়ভাবে তাকিয়ে ছিলো৷ তার অসহায় চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল সে অপরাধী সে আমাকে বলছে, সরি আজো আমি তোমাকে একটি সন্তানও দিতে পারেনি৷মানুষের চোখের একটা ভাষা আছে, যা সকলে বুঝে না। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে সবই বুঝেছিলাম।

আমি তাকে জড়িয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলাম, তোমার কোন দোষ নেই, সবই আমার কপালের দোষ। বউ আমাকে জড়িয়ে হাউমাউখাউ করে কেঁদেছিল সেদিন৷ তার কান্না আমার ভেতরটা ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিল৷

এরপর বুকে সাহস জুগিয়ে মৃত্যু শয্যায় শায়িত সন্তানের দর্শনে গিয়েছিলাম। আমার বুকের ধনকে দেখে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি৷ দেখতে ঠিক রাজপুত্রের মতই হয়েছিল৷ আমি কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তাকে মনেপ্রানে দেখছিলাম৷ মনে হয়েছিল এযেন আমার আত্না৷ কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস৷ সেদিন রাতেই তার মৃত্যু হয়৷

তার মৃত্যুতে পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে৷ আস্তে আস্তে সেই শোককে ভুলে আমরা নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি৷ পৃথিবীতে কোনকিছুই স্থায়ী না তেমনি আমাদের শোকও৷ অনেক সাধনার পর আমার ৩য় সন্তানের জন্ম হয়৷ তাকে পেয়ে আমরা সবকিছু ভুলে যাই৷ পরিবারের সবাই তাকে মনপ্রানে ভালবেসে বড় করতে থাকে৷

আমি বছরের দুইবার সন্তানকে দেখতে দেশে যাই৷ একবার সিঙ্গাপুরে ছেলে ও ছেলের মাকে ঘুরতে এনেছিলাম৷ তখন কি যে আনন্দে কেটেছিল দিন তা আপনাকে বুঝাতে পারব না৷

সেই মানিক আমার বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে আজ মারা যায়৷ আমি কিভাবে সেই কষ্ট সইব৷ তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না৷ তার কান্না দেখে আমারও দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল৷ তার কান্নায় কোন বাধা দিলাম না। সে আজ কান্না করুক মন খুলে কান্না করুক, আজ তো তার কাঁদারই দিন৷

কান্না থামিয়ে ভাই বলেছিলেন, জানেন ভাই ছেলের মৃত্যুতে বউ অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে৷ বউয়ের সামনে কিভাবে দাঁড়াব৷ তাকে কি বলে শান্তনা দিবো৷ আমি যে এক অসহায় পিতা যে সন্তানকে দেখে রাখতে পারেনি৷

আমি তার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলাম, আপনাকে শক্ত হতে হবে৷ আপনি বাড়ি গিয়ে বউয়ের পাশে দাঁড়ান নইলে উনি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়বেন৷ ফরিদ ভাই উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, হ্যাঁ ভাই আমি দেশে যাব৷ আর প্রবাসে আসব না। যার জন্য প্রবাসে পড়েছিলাম সে সন্তানই নেই, তাহলে আর প্রবাসে পড়ে থেকে কি হবে!

ফরিদ ভাই আর দাঁড়ালেন না৷ তিনি এক বুক কষ্ট নিয়ে চলে গিয়েছিলেন৷ আমি পিছন থেকে তার চলে যাওয়া দেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিলাম। এরচেয়ে আমার আর কি’বা করার ছিলো৷

এখন জানি না ফরিদ ভাই কেমন আছেন৷ তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি৷ তার সাথে কি বলে কথা শুরু করব তাই ভেবে পাচ্ছিলাম না। পৃথিবী হয়ত তার নিয়মে চলছে কিন্তু কেউ জানে না তার স্ত্রী আর তার মনের কি অবস্থা৷

বাহিরের থেকে হয়ত তারা সহজ স্বাভাবিকই থাকবেন কিন্তু ভেতর থেকে দুজন সারাজীবন সন্তান হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াবেন৷ প্রকৃতির নিয়ম উপেক্ষা করার সাধ্য কারো নেই৷একজন প্রবাসীর এভাবে অন্তদহনে পোড়ার সেই দিনটি আজো আমাকে পিড়িত করে। তার কথা মনে পড়তেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি৷

সূত্র: দশ দিগন্ত

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর

সিডনিতে ‘হারমনি ডে’ উদযাপন
৪ বছর আগে
অস্ট্রেলিয়ান সংবাদ
সিডনিতে ১২তম ‘হোয়াইট রিবন ডে’ অনুষ্ঠিত
৫ বছর আগে
অস্ট্রেলিয়াতে বাবা দিবসের কথা
৫ বছর আগে
প্রাণ হাতে নিয়ে ইউরোপ!
৫ বছর আগে
অস্ট্রেলিয়ান সংবাদ

Advertise with us
Advertise with us
আরও nobodharanews সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com