রাশেদের বাঁচার জন্য সংগ্রাম করার কথা শুনতে লাগলাম। আমি রাশেদের পাশে বসলাম। রাশেদ বলতে লাগল তার উপর দায়িত্বের এক পৃথিবী কথামালা। শুনতে শুরু করলাম রাশেদের দায়িত্বের কথা। কেউ রাশেদের উপর জোরপূর্বক দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়নি! এই দায়িত্ব, ভাগ্য তার উপর চাপিয়ে দিয়েছে। দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে সংগ্রামে নেমে পড়ল রাশেদ। রাশেদ দেশে ছোট পরিসরে একটি […]
রাশেদের বাঁচার জন্য সংগ্রাম করার কথা শুনতে লাগলাম। আমি রাশেদের পাশে বসলাম। রাশেদ বলতে লাগল তার উপর দায়িত্বের এক পৃথিবী কথামালা।
শুনতে শুরু করলাম রাশেদের দায়িত্বের কথা। কেউ রাশেদের উপর জোরপূর্বক দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়নি! এই দায়িত্ব, ভাগ্য তার উপর চাপিয়ে দিয়েছে। দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে সংগ্রামে নেমে পড়ল রাশেদ।
রাশেদ দেশে ছোট পরিসরে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছিল। কয়েকবছর চাকরিটা করার পর আর ভাল লাগল না। বিদেশে চাকরির জন্য কয়েকটি কোম্পানিতে চাকরি খুঁজতেছে। তখন তার উপর পুরো পরিবারের দায়িত্ব। চাকরি থাকাকালীন অবস্থায় আরেকটি চাকরি খুঁজতেছে। সারাক্ষণ রাশেদের চিন্তা, কবে ভাল একটা চাকরি পাবো! প্রতিদিন একটি করে চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া পত্রিকা কিনে পড়তে লাগল। চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া পত্রিকা প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত একটি একটি করে নিয়োগদাতার নিয়মকানুন পড়তে লাগল। চাকরির পত্রিকা পড়তে পড়তে শেষ পৃষ্ঠার শেষে গিয়ে হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকে!
প্রতিদিন চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া পত্রিকা ক্রয় করে। নিজের জন্য ভাল কোন বিজ্ঞাপন না পেয়ে হতাশ হয়ে যায়। বারবার হতাশ হওয়ার পরও পত্রিকা ক্রয় করে। মাঝেমাঝে তার মনে হতো আগামীকাল থেকে আর চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া পত্রিকা কিনবে না। কিন্তু, সকালবেলা মন আবার ঘুরে যেত তখন আবার কিনতো। আগ্রহ নিয়ে পড়ে আনন্দ ধূলোয় মিশে যেত। রাশেদ এভাবে কিছুদিন পার করে দিলো। কিন্তু, সংগ্রাম থেমে নেই।
বাড়ি থেকে মায়ের আকুতি, বাবা এইভাবে আর কতদিন চলবে? সংসারটা চালানো বড় দায় হয়ে পড়েছে! মায়ের কথা শুনে রাশেদ নিরুপায় হয়ে যেতো। ভাবতো আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। ভাল কোন চাকরি না পেয়ে সেই মূহুর্তে মায়ের মুখে কথাগুলো শুনে নিজের গায়ে সুঁইয়ের মত বিঁধে যেতো। পৃথিবীর মধ্যে নিরুপায় ও অপদার্থ মনে হতো নিজেকে! কি বলবে বুঝে উঠতে পারতো না। মনটাকে বারবার আশ্বাস দিয়ে রাখত।
ইতিমধ্যে রাশেদের পরিবার বেশকিছু টাকার দেনা হয়ে গেছে।
চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া পত্রিকা নিয়মিত কিনতে লাগল। হকারের কাছ থেকে চাকরির বিজ্ঞাপনের পত্রিকা কেনার নিয়মিত ক্রেতা হয়ে গেলো। প্রতিমাসের শেষে বেতনের টাকা হাতে পাবার পর হকারকে টাকা পরিশোধ করত। হকার রাশদকে বলতো মামা, চাকরিবাকরির কোন খোঁজ পাইছেন? রাশদ বলত মামা, এখনো পাইনি! খুঁজতেছি পেয়ে যাবো। হকার রাশেদের কথা শুনে বলত, খোঁজেন খোঁজেন আইজ না পাইলে কাইল তো পাইবেন।
রাশেদ বন্ধুর মাধ্যমে বিদেশে চাকরির জন্য এজেন্সিতে বায়োডাটা জমা দিয়েছে। দিনের পর দিন আপ্রাণ চেষ্টা থেমে নেই। প্রতিটা সময় পাথরচাপা দিতে থাকে পরিবারের উপর দায়িত্বের বোঝা। বিশ্বাস ছিল এখানে হয়তো ভাগ্য তার দিকে আছে। দুই মাস আগে বায়োডাটা জমা দেওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল।
আমি বললাম আত্মীয় স্বজন কেউ নেই, যারা আপনাদের সহযোগিতা করবে?
আত্মীয় স্বজন কি আর সারাজীবন সহযোগিতা করে? সব সংগ্রামে এগিয়ে আসে? আসে না। আসলেও নামমাত্র। কারোর উপর নির্ভর হওয়ার চেয়ে নিজের উদ্যোগে উদ্দেশ্যহীন হেঁটে চলা ভাল।
রাশেদের যুক্তির কাছে আমি আর কোন প্রশ্ন দাঁড় করাতে পারলাম না।
আমি নির্বাক হয়ে তার জীবনসংগ্রামের গল্প শুনছি। প্রকৃত জীবনসংগ্রামের অনন্য গল্প।
একমাস পর দুপুরবেলা রাশেদের মায়ের ফোন আসে। মা বলল, বাবা বর্ষাকাল তো শুরু কি করবি? ঘরের চালা ফুটো হয়ে গেছে। পুরোনো ঢেউটিন আর কয়বছর টেকে! যদি পারিস ঘরের চালার সামনের টিন কয়টা পাল্টা! হাঁড়িপাতিল, বালতি কয়জাগায় বসাবো! আর যদি কোন ব্যবস্থা না হয়, এবার বর্ষায় আমরা কয়টা পরান ভিজতে ভিজতে মরব।
রাশেদের মায়ের কথায় জবাব দেওয়ার কোন উত্তর জানা ছিল না। নিরুপায় হয়ে কথাগুলো শুনে মাকে মিথ্যা আশ্বাস দিলো।
রাশেদ বলল, আমার বুকের মধ্যে যে অসংখ্য ফুটো হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন সেখানে কি দিয়ে ছাউনি দিই!
রাশেদ বলল, এতোকিছুর ভিতর ভুলেই গিয়েছিলাম আমার একটা মন আছে। সেই নিরব মনটা কাউকে ভালবাসতে জানে। ভালবাসার সাগরে সাম্পান ভাসাতে জানে। শবনম নামের মেয়েটিকে কিভাবে বলব তাকে যে আমার ভাললাগে!
রাশেদ নিজের সাথে নিজে কথা বলে রোজ। ভালবাসার কথাগুলো বুকের মাঝে পাথরচাপা হয়ে পড়ে থাকে। নিজ এলাকায় শবনম নামের মেয়েটিকে আর ভাললাগার কথা বলা হয়ে ওঠে না।
রাশেদের জীবনসংগ্রামের পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মনের কোণে লুকিয়ে থাকা ভাললাগার সুপ্ত বাসনা কুঁড়ি অবস্থায় শুকিয়ে যায়।