পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় বুক বেধে বিদেশ পাড়ি জমান বাংলাদেশি নারীরা। এর মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের স্বামী-সন্তান আছে। অনেকে আবার স্বামী পরিত্যক্তা। কিন্তু পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে ফিরছেন লাশ হয়ে। আর এদের মধ্যে আত্মহত্যা করা নারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে নারীকর্মীদের আত্মহত্যা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের পরিসংখ্যান […]
পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় বুক বেধে বিদেশ পাড়ি জমান বাংলাদেশি নারীরা। এর মধ্যে অনেকেই আছেন যাদের স্বামী-সন্তান আছে। অনেকে আবার স্বামী পরিত্যক্তা। কিন্তু পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে ফিরছেন লাশ হয়ে। আর এদের মধ্যে আত্মহত্যা করা নারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে নারীকর্মীদের আত্মহত্যা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের পরিসংখ্যান দেখে বলা যায়, নারীকর্মীদের জন্য মধ্যপ্রাচ্য অনিরাপদ।
জানা গেছে, নারীকর্মীরা যেসব মালিকের অধীনে কাজে যোগ দিচ্ছেন, সেসব মালিকের অমানবিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। তবে এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো মাথা ব্যথায় নেই।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে যান মুন্সিগঞ্জ সদরের জহুরা বেগম (৩২)। একমাত্র সন্তানকে ভালোভাবে লালন-পালনের আশায় তিনি বিদেশ পাড়ি দেন। তার সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। মাত্র তিন মাসের মাথায় ২০১৮ সালের ১৩ মে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে সৌদি আরব থেকে খবর আসে। মৃত্যুর ৯ মাস পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জহুরার লাশ দেশে আসে।
পরিবারসহ কেউই এমন আত্মহত্যার রহস্য জানে না। কারণ উদঘাটনেও কারও মাথা ব্যথা নেই। আশ্চয্যের বিষয়, নারীকর্মীদের আত্মহত্যা নামক মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে ভ্রুক্ষেপই নেই কারো। তবে দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরকারি খরচে এসব নারীকর্মীদের মরদেহ দেশে এনেই দায়িত্ব শেষ করছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের হিসেব অনুযায়ী, প্রবাসে কাজ করতে গিয়ে গত তিন বছরে আত্মহত্যা করেছেন ৪৪ জন নারীকর্মী। প্রবাসে মৃত কর্মীর লাশ সরকার নিজ খরচে দেশে আনে। কিন্তু তারা কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন সেসবের কারণ জানার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনেক পরিবারের সদস্য লাশ ফেরত নিতে চান না। বিদেশ থেকে লাশ আনার জন্য আবেদনও করেন না। ফলে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে ঠিক কতজন মারা যায় বা আত্মহত্যা করে, তার সঠিক হিসেবও জানা যায় না।
চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশ থেকে ২৩ নারীকর্মীর লাশ এসেছে। এর মধ্যে আত্মহত্যার কারণে মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের। এছাড়া গত তিন বছরে ২৯৪ জন নারীকর্মীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ৫৭ জন, ২০১৭ সালে ১০২ এবং ২০১৮ সালে ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত নারীকর্মীদের মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন ৪৪ জন।
এদিকে হৃদযন্ত্রের জটিলতায় মৃত্যু হয়েছে ১১০ জন নারীকর্মীর। ফেরত আসা লাশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে সৌদি আরব থেকে, যার সংখ্যা ১১২। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২৬, ওমান থেকে ৩৪, লেবানন থেকে ৪২ এবং জর্ডান থেকে ৬২টি নারীকর্মীর লাশ এসেছে। ২০১৬ সালেল এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সৌদি আরবে নারীকর্মীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে।
তবে নারীকর্মীদের আত্মহত্যার প্রবণতায় সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস উদ্বিগ্ন। গত বছর দূতাবাসের সেফহোমে কল্পনা নামের এক নারীকর্মী আত্মহত্যা করেন। প্রাথমিক তদন্তে কল্পনা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কল্পনা কোনো এক কারণে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি। তবে তার এ অবস্থার কারণ জানা যায়নি। জানা গেলে আত্মহত্যার কারণ জানা যেত।
তবে প্রবাস ফেরত নারীকর্মীদের অধিকাংশই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের কথা জানান। এর মধ্যে হালিমা খাতুন (ছদ্মনাম) জানান, অনেক স্বপ্ন নিয়ে দালালে ধর কাজের আশায় পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরব। এজন্য দালালকে ৪০ হাজার টাকা দিতে হয়। চুক্তি হয়েছিল ৮০ হাজার টাকার। বাকি টাকা কাজে যোগ দিয়ে মাসিক বেতন এক হাজার রিয়াল থেকে দিতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বুঝে নিয়ে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গত ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব যান তিনি।
জেদ্দা এয়ারপোর্টে নামার পর রিক্রুটিং এজেন্সির এক লোক তাকে একটি বাড়িতে রাখে। চারদিক বন্ধ ওই বাড়িকে ক্যাম্প বলা হয়। সেখানে তার সঙ্গে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের দেখা হয়। তাদের কাছে শোনেন পাশবিক নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা।
এসব ঘটনায় অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বোমসা) নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলামের ধারণা, কেউ মরার জন্য সৌদি আরব বা বিদেশ যায় না। তাদের কোনো না কোনোভাবে মেরে ফেলা হয়। সেখানকার কর্মপরিবেশ এবং নিয়োগকর্তারা আত্মহত্যার জন্য বাধ্য করে বলে জানান তিনি।
২৫০ শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছেন উল্লেখ করে তিনি জানান, তাদের দিকে তাকালে বোঝা যায় তারা কেউ আত্মহত্যা করতে যায়নি। তারা প্রত্যেকেই স্বপ্ন নিয়ে গেছে। বেশিরভাগ আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে- আসলে কি মেরে ফেলে নাকি এরা আত্মহত্যা করে। এ ধরনের ঘটনা ঘটার পর সৌদি সরকার ময়নাতদন্তে যাই লিখে দেয় তাই বিশ্বাস করতে হয়। এ পর্যন্ত কোনো মৃতদেহের নিরপেক্ষ ময়নাতদন্ত হয়নি। সৌদি সরকার কখনও তাদের নাগরিকের বিপক্ষে অবস্থান নেবে না।
সূত্র: দশ দিগন্ত