হাসান ফিরবেন, আমাদের নব্বুই দশকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিকাতরতার দিনগুলোকে আবারো ফিরিয়ে আনবেন – এমন এক আকুলতা অনেকদিন পুষে রেখেছিলাম মনের মধ্যে। যে হাসান-জেমস-বাচ্চু মানেই সঙ্গীতের মূর্ছনা, ব্যান্ডগুলোর সেইসব সোনালী দিনে গানের জোয়ারে মনে আসা ঢেউ- সেই একটা যুগের জোয়ার হঠাৎ করে স্তিমিত হয়। আরো অনেকের মতো হাসান আমরা আর দেখি না কোথাও। এইসময়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অভ্যুত্থানে […]
হাসান ফিরবেন, আমাদের নব্বুই দশকের ছেলেমেয়েদের স্মৃতিকাতরতার দিনগুলোকে আবারো ফিরিয়ে আনবেন – এমন এক আকুলতা অনেকদিন পুষে রেখেছিলাম মনের মধ্যে। যে হাসান-জেমস-বাচ্চু মানেই সঙ্গীতের মূর্ছনা, ব্যান্ডগুলোর সেইসব সোনালী দিনে গানের জোয়ারে মনে আসা ঢেউ- সেই একটা যুগের জোয়ার হঠাৎ করে স্তিমিত হয়।
আরো অনেকের মতো হাসান আমরা আর দেখি না কোথাও। এইসময়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অভ্যুত্থানে শিল্পীদের আর্থিক ক্ষতি পোহাতে হলো। কেউ আর সিডি কেনে নাম ক্যাসেটের যুগ তো আরো আগেই পার হয়ে গেছে। এর ভেতরে আবার ব্যান্ডগুলোতেও ভাঙ্গনের ধ্বনি শুরু হয়।
এমনই যখন পারিপার্শ্বিক অবস্থা তখন নস্টালজিয়ায় ভুগতে ভুগতে আমরা কাতর হই কেবল। আর মনে আশা, আবার ফিরুক সোনালী বিকেল। আবার আসুক, সুখের দিনগুলো। আবার বিষন্নময়তার সঙ্গী হোক, হৃদয়ের উথলে উঠা অনুভব শান্ত হোক গানে গানে।
সেই মনো আকাঙ্ক্ষা খানিকটা হলেও পূর্ণ হতে যাচ্ছে। ফিরে আসছেন আমাদের হাসান, আর্কের সেই হাসান। ফিরছেন মানে ভালোভাবেই ফিরছেন। একদম নতুন ফ্রেশ একটা স্টার্ট। নতুন লাইনআপ নিয়ে। এই ২৭ সেপ্টেম্বর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনসার্ট করার মাধ্যমে শুরু হলো আর্কের নতুন যাত্রা। আহ, এ যেন এক অদ্ভুত স্বস্তিও। মনে হচ্ছে, হারিয়ে ফেলা প্রিয় কাউকে অনেকদিন বাদে খুঁজে পাওয়ার অনুভূতি।
আর্কের পথচলার গল্পটা এই ফাঁকে একটু বলি।

ব্যান্ড হিসেবে আর্কের শুরু ১৯৯১ সালে। চাইম ব্যান্ড থেকে বেরিয়ে গুণী মিউজিশিয়ান আশিকুজ্জামান টুলু সে বছর শুরু করেছিলেন আর্ক ব্যান্ডটি। প্রথম দিকে অবশ্য ছিলেন না, এই ব্যান্ড দিয়েই মানুষের অন্তরে পৌঁছে যাওয়া শিল্পী হাসান৷ তিনি যোগ দিয়েছিলেন আর্কের প্রথম অ্যালবাম রিলিজ হওয়ার পর। বন্ধু পঞ্চম তাকে পরিচয় করিয়ে দেন আশিকুজ্জামান টুলুর সাথে। তিনিই হাসানকে সুযোগ দেন ব্যান্ডে।
হাসান আসবার পর নতুন একটা লাইনআপ দাঁড়ায়। এই নতুন লাইনআপ ১৯৯৬ সালে প্রকাশ করে তাজমহল অ্যালবামটি। রিলিজের পর পরই যেন একটা ঝড়ের সৃষ্টি হলো। তুমুল ভালবাসার জোয়ারে ভাসলো আর্কের তাজমহল অ্যালবাম। পাড়া মহল্লায় সব জায়গায় বাজতে থাকলো দিনের পর দিন এই গানগুলো।
নব্বুই দশকটা তো ব্যান্ডদলগুলোর এক সোনালী সময়৷ সেই সময়ে আর্ক যেন নতুন মাত্রা যোগ করলো। আর লোকে অবাক হয়ে পরিচিত হলো এক অসাধারণ প্রতিভা হাসানের সাথে। হাই পিচে তিনি যতটা দূর্দান্ত ভোকাল, একই সাথে লো পিচেও অতটাই মোলায়েম। এই অদ্ভুত কম্বিনেশনের ভোকাল বাংলাদেশ খুব একটা পায়নি।
তারচেয়ে বড় ব্যাপার, হাসানের মধ্যে অনেকে মাইকেল জ্যাকসনের একটা প্রভাব আবিষ্কার করলো। তিনি যে ভঙ্গিতে গান গান, তার পোষাক, লম্বা কালো চুল, মাথায় কালো হ্যাট, চোখে কাল চশমা সব মিলিয়ে একটা মিল খোঁজার চেষ্টা অমূলকও নয়। হাসান বেশ ভাল ইংরেজি গানও গাইতেন। এমনকি, আর্ক ব্যান্ডের তাজমহল এলবাম রিলিজের আগে তিনি ইংরেজি গানই কভার করে বেড়াতেন বিভিন্ন শোয়ে৷ তিনিও নিজেও মাইকেল জ্যাকসনের ভক্ত, তবে তিনি নিজেকে স্বতন্ত্রই ভাবেন।
হাসানের পুরো নাম সৈয়দ হাসানুর রহমান। গানের তালিম নেননি কোথাও তবুও তাকে বলা হয় তিনিই নাকি বাংলাদেশের সেই বিরল ভোকালিস্ট যিনি ছয়টা স্কেলে গান গাইতে পারতেন। তার গান আশ্চর্যজনকভাবে কলকাতায়ও ভীষণ জনপ্রিয় হয়৷ কলকাতার তরুণ অনেক গানের দল হাসানের গান কাভার করেছে কত শোতে তার কোনো হিসাব নেই। নব্বুই দশকের শেষদিকে হাসানের জনপ্রিয়তা এত তুঙ্গে ছিল যে, তিনি সেই সময় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া শিল্পী ছিলেন।
এই মানুষটা হুট করেই যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের কাছে নব্বুই দশকের প্রতিশব্দ বলতে যা যা বুঝি, সেখানে হাসান এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই হাসানের হারিয়ে যাওয়া যতটা ব্যাথা দিয়েছে, ততটা আবার প্রাণে স্পন্দন জেগেছে তার ফিরে আসার খবরে। এমনিতে অবশ্য ফিরে আসার আভাস পাওয়া যাচ্ছিলো। উইন্ড অব চেঞ্জের আয়োজনেও গান গেয়েছিলেন কিছু মাস আগে।
এবার নতুন লাইন আপ হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে হাসান আর্ক ব্যান্ড নিয়ে ফিরছেন। ভোকাল হিসেবে হাসান মঞ্চ মাতাবেন। সাথে মঞ্চ কাঁপাবেন দুর্দান্ত কিছু মিউজিশিয়ান। ড্রামে আছেন ইমতিয়াজ আলী জিমি, বেজ গিটারে বুনো, গিটারে এসআই সুমন, কিবোর্ডে আজিজুর রহমান টিংকু।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা স্বাক্ষী হয়েছে এক অসাধারণ এক সময়ের। হাসান সেই চিরচেনা রুপে। গেয়েছেন তার কালজয়ী সেসব গান। আর্ক ব্যান্ডের যে গানগুলো হৃদয়ে গাঁথা সবার। নতুন লাইনআপ এবং নতুন করে সব শুরু করার জন্য ধন্যবাদ হাসান। এবার তবে নতুন সৃষ্টি হোক, আমরা আবার আরেকটা যুগের স্বাক্ষী হই। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে উঠুক ব্যান্ড আর্ক।
সূত্র: দশ দিগন্ত