ড. আব্দুল ওয়াদুদ এক বিচিত্র মানুষ। পাখির সাথে তার প্রেম, পাখির সাথেই তার সংসার। তার সংগ্রহশালায় আছে বিশ্বের ৮৭টি দেশের পাঁচ শতাধিক দুর্লভ পাখি। তার পাখি সম্ভারের মূল্য চার কোটি টাকা। পাখির পিছনে তার মাসে খরচ তিন লাখ টাকা। শুধুমাত্র শখের বসে তিনি এই বিশাল পাখি সম্ভার গড়ে তুলেছেন। ক’দিন আগে তিনি আমেরিকা থেকে ৬০ […]

ড. আব্দুল ওয়াদুদ এক বিচিত্র মানুষ। পাখির সাথে তার প্রেম, পাখির সাথেই তার সংসার। তার সংগ্রহশালায় আছে বিশ্বের ৮৭টি দেশের পাঁচ শতাধিক দুর্লভ পাখি। তার পাখি সম্ভারের মূল্য চার কোটি টাকা। পাখির পিছনে তার মাসে খরচ তিন লাখ টাকা। শুধুমাত্র শখের বসে তিনি এই বিশাল পাখি সম্ভার গড়ে তুলেছেন। ক’দিন আগে তিনি আমেরিকা থেকে ৬০ লাখ টাকা মূল্যের বিশ্বের সবচেয়ে দামি ও বিরল এক জোড়া প্যারাডাইস পাখিও কিনে এনেছেন। এ ছাড়া একই সময়ে ৩৫ লাখ টাকায় আমেরিকান হোমিং বার্ড ও আমেরিকান কড নামের আরো দু’টি পাখির জোড়া কিনেছেন। সেই সাথে সপ্তাহ তিনেক আগে তার পাখি সম্ভারে আমেরিকার দুর্লভ পাখি বস্নু গোল্ড ম্যাকাও ও অষ্ট্রেলিয়ার কিং প্যারট বাংলাদেশে প্রথম বাচ্চা দিয়েছে। জন্ম নেয়া বস্নু গোল্ড ম্যাকাও এর দু’টি ও কিং প্যারটের আরো দু’টি বাচ্চা ভালো আছে। বাচ্চা চারটি বাংলাদেশের পরিবেশের সাথে মানিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। পাখি চিকিৎসকরা নিয়মিত বাচ্চাগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন। ঢাকার হাতির পুলে সোনারগাঁও রোডে ২২/২ নম্বর বাসায় তার এই বিশাল পাখি সম্ভার। ড. ওয়াদুদ বলেন দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি পাখি পোষেন এবং পাখি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। গবেষণা করতে গিয়ে তিনি পাখি নিয়ে ফিকামলি তথ্য আবিষ্কার করেন। ড. ওয়াদুদ বলেন, পাখি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পরিমিত খাদ্য গ্রহণ করে। সময়মত ঘুমাতে যায় ও ঘুম
থেকে জেগে ওঠে। খাবার গ্রহণের পূর্বে সে বিভিন্ন ধরণের অঙ্গভঙ্গি করে। শারীরিক কসরত করে, যা ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়ামের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। পাখির স্মার্টনেস, বিভিন্ন রং, সৌন্দর্য্য আমাদের মুগ্ধ করে। পাখি দেখার সাথে সাথে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার মন সতেজ হয়ে উঠে। পাখি আমাদের আনন্দ দেয়। পাখির সানি্নধ্যে এলে মনের সুস্থতা বাড়ে অনেকগুণ। পাখির এসব দিকগুলো দীর্ঘ গবেষণা করে ড. আব্দুল ওয়াদুদ ফিকামলি তত্ত্বের আবিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন ফিকামলি হল পাখি, ব্যায়াম, ধ্যান এ তিনের সমন্বয়ে দেহ, মন ও আত্মার সুস্থতার জন্য বিনোদন ভিত্তিক অনুশীলন পদ্ধতি। সুস্থতা বলতে শুধু শারীরিক সুস্থতাকে বুঝায় না। শরীর, মন ও আত্মার সম্মিলিত সুস্থতাই প্রকৃত অর্থে সুস্থতা। শরীরের সুস্থতার জন্য ব্যায়াম আর ব্যায়ামের মাধ্যমে ফিজিওথেরাপী, মনের সুস্থতার জন্য পাখি আর পাখির মাধ্যমে ক্যাথারসিস থেরাপি, আত্মার সুস্থতার জন্য ধ্যান আর ধ্যানের মাধ্যমে মলিফিকেশন থেরাপি। সুস্থতার জন্য এ তিনটি থেরাপির আদ্যাক্ষর মিলে ফিকামলি’। ড. ওয়াদুদ জানান, দীর্ঘ গবেষণালব্ধ ও পরীক্ষিত এই পদ্ধতির ব্যায়াম শরীরকে নিরোগ, মনকে সতেজ ও প্রফুল্ল রাখে। অনাবিল আনন্দ, মানসিক প্রশান্তি ও চিত্ত বিনোদনের জন্য সব বয়সের নারী পুরুষের কাছে এ ব্যায়াম সহজ ও বেশি কার্যকরী। বিশেষ করে বস্নাড প্রেসার, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ক্রোধ-টেনশন দূরীকরণে ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে এ ব্যায়াম অতুলনীয়। বাচ্চাদের মানসিক বিকাশে এ ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ফিকামলি ব্যায়াম জগতে এক নতুন ধারণা ও পদ্ধতির উদ্ভাবন। ১৫ বছর ধরে তিনি পাখি পোষেন। পাখি পুষতে গিয়ে তিনি এই তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। তার সংগ্রহশালায় সেখানে চিড়িয়াখানার সঙ্গে প্লাটিনাম জিম নামে তার একটি জিমনেসিয়ামও আছে। গড়ে তোলা ওই মিনি চিড়িয়াখানা ও প্লাটিনাম জিমে পশু পাখির বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি অনুকরণ ও অনুসরণ করে ব্যায়াম, অ্যারোক্সি, যোগাসন ও মেডিটেশন শেখানো হয়। আগ্রহী দর্শনার্থীরা তার চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করতে পারেন এবং ফিকামলি ব্যায়াম অনুশীলন করতে পারবেন। তার সংগ্রহশালায় আরও আছে অবাক পাখি স্কারলেট ম্যাকাও। আরো আছে ৪০ লাখ টাকায় কেনা বিরল পাখি বস্নু গোল্ড ম্যাকাও। তার সম্ভারে থাকা ১৪ লাখ টাকা মূল্যের স্কারলেট ম্যাকাও দেখতে শুধু সুন্দরই নয়, এর আছে বহুগুণও। ড. ওয়াদুদ জানান শেখালে পাখিটি মানুষের অনুকরণে কথা বলতে পারে, খেলাধূলা করতে পারে কিছু কিছু। এমনকি খেলনা সাইকেলও চালাতে পারে। এই পাখি সবার সাথে মিশতেও পারে। সারা দুনিয়ায় এই জাতের পাখি খাঁচায় পোষা আছে মাত্র ২০০টি। সার্ক দেশগুলোতে এর সংখ্যা ১০টির বেশি নয়। পাখিটির দৈর্ঘ্য ৩৩ থেকে ৩৫ ইঞ্চি হয়ে থাকে। গভীর জঙ্গলে বড় গাছের কোঠরে বিশেষ করে পাইন গাছে পাখিটি বাসা বাঁধে। এদের গড় আয়ু ৫০ বছর। এই পাখি বছরে এক থেকে দুইবার চারটি ডিম পাড়ে। দক্ষিণ আমেরিকার আমাজান জঙ্গলে বসবাসকারী স্কারলেট উপজাতির লোকজন এই পাখির পালক দিয়ে তাদের বাহারী পোশাক ও মুকুট তৈরি করে। এ ছাড়া বস্নু গোল্ড ম্যাকাও দুসপ্রাপ্য বিরল প্রজাতির পাখিটি যেমন বাহারী রঙ, তেমনই চমক লাগানো এর কাজ কর্ম। সুদূর আমেরিকা অঞ্চলের এই পাখি বাংলাদেশের টিয়া পাখি সমগোত্রীয়। গড়ন তেমনই, তবে আকারে অনেক বড়। এদের আদি নিবাস প্রধান পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বনাঞ্চল আমাজান জঙ্গলে। এই বিরল প্রজাতির পাখি উপমহাদেশে ১০টির বেশি নেই। একবার তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। এতই আকর্ষণীয় ও বর্ণিল এর চেহারা, পাখনার উপরিভাগ মাথা থেকে পিঠ হয়ে লেজ পর্যন্ত গাঢ় নীল রং-এর। গলা ও পাখনার নিচের অংশের রং স্বর্ণালী। মুখমন্ডল বা চেহারা সাদা জমিনের ওপর কালো ডোরাকাটা। মাথায় ঝুঁটি নেই। বস্নু-গোল্ড ম্যাকাও সম্পর্কে তিনি জানান, ব্রাজিল, মেক্সিকো, কোস্টারিকা, পানামা ও এলসালভাদরসহ ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে পাখিটি দেখা যায়। টিয়ার মতো এই ম্যাকাও পাখিও শখ করে মানুষ পুষে থাকে। উপমহাদেশের আর্দ্রতা আর তাপমাত্রা ওদের উপযোগী নয়। এই পাখিটাসহ দুস্প্রাপ্য আরও অনেক পাখির সংগ্রহ রয়েছে তার ব্যক্তিগত ওই মিনি চিড়িয়াখানায়। দুসপ্রাপ্য ওইসব পাখি রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। পরিচর্যায় একটু ব্যতিক্রম বা অবহেলা হলেই মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। টাকার অংক ও মৃত্যুর ধকল অনেক বেশি হলেও আরেক জোড়া সংগ্রহ করা তার চেয়েও কঠিন বলে জানান তিনি। ড. ওয়াদুদ বাংলাদেশ ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন অ্যান্ড রিয়ারিং এসোসিয়েশনের মহাসচিব। দেশি পাখি বেসরকারিভাবে খাঁচায় বা চিড়িয়াখানায় পোষার ব্যাপারে সরকারি বিধি নিষেধ রয়েছে। সরকারি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই তিনি সেটি থেকে বিরত রয়েছেন। তার ওই মিনি চিড়িয়াখানায় সংগৃহীত পাখিগুলো সুন্দর এবং নামও বাহারি। আব্দুল ওয়াদুদ জানালেন, ১৯৯৭ সালে গোল্ড ম্যাকাও দুটি আনা হয় ব্রাজিল থেকে। প্রথম দিকে কলা তরল করে ফিডার দিয়ে খাওয়ানো হতো। ধীরে ধীরে পাখি দুটি প্রশিক্ষণের পর কথা ও মানুষের আচরণ বুঝতে শেখে। তিনি ১৪ বছর ধরে বস্নু গোল্ড ম্যাকাও পাখির ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর ওপর গবেষণা করেন। এর আগে দুবার ডিম দিলেও শেষ পর্যন্ত বাচ্চা ফোটেনি। এবার চেষ্টা সফল হয়েছে। এটি ছিল তার জন্য বড় রকমের চ্যালেঞ্জ। ড. ওয়াদুদ আরও জানালেন, দৃষ্টিনন্দন এই পাখি ব্রাজিল, বলিভিয়া, ত্রিনিদাদ, মেক্সিকো কোস্টারিকা ও পানামার গভীর জঙ্গলে দেখা যায়। বস্নু গোল্ড ম্যাকাওয়ের প্রধান খাদ্য বাদাম, ভুট্টা, সূর্যমুখী ফুলের বীজ, শসা, কলা, আপেল, কমলা, গাঁজর, বরবটি, পেঁপে, আঙ্গুর ইত্যাদি। এরা সাধারণত ছয় মাস পরপর দুটি থেকে সর্বোচ্চ চারটি ডিম দেয়। কথা বলে সকালে ও বিকেলে। মানুষের অনুকরণে কথা বলা ছাড়াও খেলাধূলা, শারীরিক কসরত করতে পারে পাখিটি। তার সংগ্রহশালায় আরও যে সব বিরল পাখি রয়েছে তা হলো গ্রীন উইং ম্যাকাও, হ্যান্স ম্যাকাও, কাইক, পিন্যান্ট, সিনাসন, আফ্রিকান গ্রে প্যারট, লেডি আমহাস্ট, রোবিনো, রোজেলা ব্যাক ক্যাপ, বাজরিকা, ইস্টার্ন রোজেলা, আমাজান প্যারট, রক পাবলার বুরকিস, ক্যারাকিট, কাকারাকি, বিভিন্ন প্রজাতির কাকাতুয়া, সানকর্নার, হলুদ, সিলভার বস্নু-ধূসরসহ বিভিন্ন রং ও প্রজাতির টিয়া, বাজরিগর, জাভা, ইলেক্টাস, র্যাম, ডায়মন্ড ডাভ, গ্রীন ডাভ, ফিঞ্চ, রেইনবো লরী, চ্যাটারি লরী, ব্যাক ক্যাপ লরী, জানদিয়ার, প্যারাকিট, মুলুকান কাকাতুয়া, সালফার ক্যাস্টেট কাকাতুয়া, গোল্ডেন ফ্রিজেন্ট, সিলভার ফ্রিজেন্ট, পোর্ট লিংকন, মংক প্যারাকিট, প্রিন্সেস অব ওয়েলস, আমেরিকান কুট, হেরিং গার্ল, নর্দান পিনটেইল, নাট ক্রাকার, ওয়াল ক্রিপার, স্টোন কার্লি প্রভৃতি। ড. ওয়াদুদ জানান হাতিরপুলের সোনারগাঁও রোডের ২২/২ নম্বর বাসায় তার মিনি চিড়িয়াখানা দর্শনার্থীরা বিনামূল্যেই পরিদর্শন করতে পারেন। একই সঙ্গে এসব পাখি পুষতে আগ্রহীদের সেখান থেকে সহায়তাও করা হয়। সম্প্রতি তিনি বগুড়ায় এক অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। সেখানেই তিনি তার পাখির জগতের সম্পর্কে প্রতিবেদককে জানান। তিনি বলেন তার আশা ভবিষ্যতে তিনি বগুড়া সহ দেশের প্রতিটি জেলায় পাখির চিড়িয়াখানা সহ ফিকামলি সেন্টার বানাবেন।