আফতাব চৌধুরী : মানব জাতি হচ্ছে আল্লাহতালার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি এবং বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতরা হচ্ছেন শ্রেষ্ঠতম উম্মত। প্রত্যেক ইমানদার মানুষ একথা বিশ্বাস করেন যে, হাশরের কঠিন প্রান্তরে সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহপাকের সম্মুখে প্রত্যেক প্রাণীকে প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে এবং ভয়ানক ওইদিনে বিশ্বনবীর সুপারিশ ব্যতীত মুক্তিলাভের কোনো উপায় নেই। ইসলাম জন্ম থেকে কবরে […]
আফতাব চৌধুরী : মানব জাতি হচ্ছে আল্লাহতালার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি এবং বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতরা হচ্ছেন শ্রেষ্ঠতম উম্মত। প্রত্যেক ইমানদার মানুষ একথা বিশ্বাস করেন যে, হাশরের কঠিন প্রান্তরে সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহপাকের সম্মুখে প্রত্যেক প্রাণীকে প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে এবং ভয়ানক ওইদিনে বিশ্বনবীর সুপারিশ ব্যতীত মুক্তিলাভের কোনো উপায় নেই। ইসলাম জন্ম থেকে কবরে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কাজের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেয়া আছে যেগুলো অনুসরণ করলে প্রতিটি কাজে অসংখ্য নেকি পাওয়া যায়, অপব্যয় করার পাপের সম্ভাবনা থাকে না এবং সামাজিক সমস্যা সৃষ্টিরও সম্ভাবনা থাকে না। বিবাহ হচ্ছে নবীজির সুন্নত এবং নবীজি বলেন, ‘যে আমার সুন্নতকে প্রত্যাখ্যান করবে সে আমার উম্মত নয়।’ মোহর ছাড়া বিবাহ হতে পারে না এবং ওই মোহর স্ত্রীদের প্রাপ্য। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য মুসলমান পুরুষ যখন মোহরের টাকা অথবা অলঙ্কার প্রদানে অসমর্থ বলে সময়মতো বিয়ে করতে পারছেন না, সেখানে আমাদের দেশে প্রচলিত বাকি মোহর সিস্টেমে খেয়াল-খুশিমতো বিশাল পরিমাণ মোহর কাবিনের কাগজে লিখে রেগুলার বিয়ে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তালাক হয়ে গেলে বাকি মোহর আদায়ের জন্য আদালতের দরজায় জীবনের অনেক মূল্যবান বছর নষ্ট করতে হচ্ছে। ইদানীং অন্যধর্মী সমাজের অনুকরণে মুসলিম সমাজেও হারাম যৌতুক প্রথার ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছে, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বিবাহে অপ্রয়োজনীয় খরচের বহর বেড়েছে বহুগুণ। ইসলাম বলেছে, অপচয়কারী শয়তানের ভাই এবং শয়তান অভিশপ্ত। অনাড়ম্বরভাবে সম্পন্ন বিবাহকে আল্লাহপাক ভালোবাসেন। আজকাল বিবাহের কথাবার্তায় স্ত্রীলোকের মোহরানার কথা বাদ দিয়ে বরের মোটরসাইকেল, গাড়ি এবং নগদ টাকার দাবি নিয়ে নির্লজ্জভাবে কথা বলছে। এক মুসলমান আরেক কন্যাদায়গ্রস্ত মুসলমান ভাইকে বিপদগ্রস্ত করতে লজ্জাবোধ করছে না। আগে যেখানে মোহরানা নির্ধারণের পর পাত্রপক্ষ পাত্রীপক্ষকে এবং পাত্রীপক্ষ পাত্রপক্ষকে সাধ্যমতো দান-মান করার দায়িত্ব সমঝে নিত, আজকাল ঘটকরা কমিশনের বিনিময়ে প্রকাশ্যে দরদাম করছে। পাত্র যদি নামমাত্র চাকরিজীবী অথবা ব্যবসায়ী হয়, তবে সে নিজে নতুবা তার মা-বাবা সম্ভাব্য পাত্রীর মা-বাবাকে যৌতুকের নামে নাজেহাল করে ছাড়ে। অনেক উপার্জনশীল পাত্রের বাবা পুত্রের বিবাহের যৌতুকস্বরূপ পাত্রীর মা-বাবার কাছ থেকে বাংলাদেশের কোরবানির বাজারে বিশাল সাইজের বলদের মালিকের মতো আকাশচুম্বী মূল্য দাবি করছে। আজকাল কন্যাদায়গ্রস্ত মুসলিম পরিবারগুলোয় যৌতুকের মোটরসাইকেল-গাড়ির আতঙ্ক ভূতের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। অত্যন্ত যত্ন এবং আদরের সঙ্গে বহু অর্থ খরচ করে লালন-পালন করার পর বিবাহের বয়সে উপনীত হওয়ার পর পাত্রীর সৌন্দর্য, শিক্ষাদীক্ষা, বংশমর্যাদা কিংবা দ্বীনদারীকে প্রধান্য না দিয়ে লোভী-শয়তানরা নগদ টাকা এবং বহুমূল্য জিনিসপত্র দাবি করে পাত্রীর অভিভাবকদের রাতের ঘুম হারাম করে ছাড়ছে। একাধিক মেয়ে থাকা পরিবার প্রথম মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে আকণ্ঠ ঋণে ডুবে যাচ্ছে অথচ ইসলামী নিয়মনুসারে বিয়ে হলে দশ মেয়ের বাবাকেও চিন্তায় চুল ছিঁড়তে হতো না। মুসলিম সমাজের কলঙ্ক, মেরুদ-হীন, নির্লজ্জ একশ্রেণীর যুবকের মাথায় হেরোইনের নেশার মতো মোটরসাইকেলের নেশা চেপেছে। কেবলমাত্র মোটরসাইকেলের জন্য অন্তিম পর্যায়ে অনেক বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। অনেক পয়সাওয়ালা লোক বেছে বেছে ধনী লোকদেরকে দাওয়াত দিয়ে হোটেলে বিয়ের পার্টি দিচ্ছে। বিশ্বনবী বলেছেন, ‘যে ওয়ালিমায় শুধু ধনীদের দাওয়াত দেয়া হয় কিন্তু গরিব-ফকিরদের দাওয়াত দেয়া হয় না, সে ওয়ালিমা সবচেয়ে নিকৃষ্ট।’ বিবাহের ভোজসভায় ব্যাপক হারে খাদ্যবস্তুর অপচয়ের গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা করুন। বরের জন্য নির্দিষ্ট খাবারের থালায় খাদ্যবস্তু দ্বারা মুরগির মূর্তি নির্মাণ বন্ধ করুন। পান বাটার নামে থার্মোকলের বিশাল দামি অপ্রয়োজনীয় বাটার পরিবর্তে পত্রিকার কাগজ ব্যবহার করে প্রচুর টাকা সাশ্রয় করুন। কিছুসংখ্যক লোকের আবিষ্কার ‘বিয়ের মচা’ দেয়ার প্রথাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করুন। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে অহেতুক খরচ করে দুনিয়া এবং আখেরাতে বিপদগ্রস্ত হওয়া বোকামি ছাড়া কিছু নয়। গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী হাজার হাজার কন্যাদায়গ্রস্ত, অভাবগ্রস্ত এবং ঋণভারে জর্জরিত মুসলমান ভাইদের ব্যাপারে একটিবার ভেবে দেখুন, কিভাবে একেকটা সামাজিক কু-প্রথা প্রতিটি পরিবারের আর্থিক মেরুদ- ভেঙে দিচ্ছে। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো যৌতুক, ইফতারি, চুঙাপিঠা এবং খৈ-চিড়ার চাপে চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে। অবৈধভাবে অর্থ-অর্জিত লোকরা নিজের মেয়ে অথবা বোনের বিয়েতে মোটরসাইকেল অথবা গাড়ি উপহার দিয়ে গ্রামের অন্য দশজনের জন্য বিপদ সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য হয়ে জমিজমা বিক্রয় করে, বন্ধক রেখে অথবা সুদে টাকা নিয়ে বরের জন্য মোটরসাইকেল কিনতে বাধ্য হচ্ছে। জায়েজ উপহার এবং চাপ দিয়ে আদায় করা হারাম যৌতুকের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে। যৌতুকের অভিশপ্ত মোটরসাইকেল নিয়ে অনেক নির্লজ্জ বর বাস-ট্রাকের নিচে ঢুকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। অনেকের হাড়গোড় ভেঙেছে, কেউ কেউ ফ্রি মোটরসাইকেলের আনন্দে বিভোর হয়ে স্ত্রীকে বেমালুম রাস্তায় ফেলে বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছে, টের পায়নি।
মুসলিম সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার গুরুদায়িত্ব যুবক সমাজ এবং সম্মানিত আলেমসমাজকে নিতে হবে। ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে সাংবাদিক বন্ধুরাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখুন। প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শহরে, প্রতিটি মহল্লায়-মসজিদে শুক্রবার জুম্মার নামাজে, পবিত্র ঈদের দিনে ঈদগাহের বিশাল জনসমাবেশে, ওয়াজের মাহফিলে আলোচনা করুন। পেশাদার ঘটক যারা ঘুষের বিনিময়ে মেয়েদের অভিভাবককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, বিবাহে যৌতুক এবং নগদ টাকার প্রচলন ঘটাচ্ছে, অবিলম্বে এ মানুষগুলোকে শনাক্ত করুন। এই অবস্থা বেশিদিন চললে মানুষ কন্যা সন্তানকে আপদ হিসেবে মনে করে চূড়ান্ত অনাদর করবে যা ইসলামে নিষিদ্ধ। বিশ্বনবী নিজের কলিজার টুকরো কন্যা হযরত ফাতেমাকে (রা.) যিনি বেহেশতে সমস্ত নারীদের নেত্রী হবেন, অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে বিবাহ দিয়েছেন।
আজ যারা নিজের বিয়েতে নির্লজ্জের মতো যৌতুক দাবি করেছে, নিজের মেয়ের বিয়েতে মোটরসাইকেল দেয়ার মতো সামর্থ্য ভবিষ্যতে থাকবে বলে গ্যারান্টি দিতে পারবে কি? নিজের বৈধ উপার্জন থেকে ক্রয় করা মোটরসাইকেলে চেপে স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বুঝুন সম্মান বলতে কি বোঝায়?
আইনের মাধ্যমে যৌতুক প্রথা নির্মূল অসম্ভব। আজকাল পত্রপত্রিকায় যৌতুকের বলি মুসলিম রমণীদের ফটোসহ মৃত্যুসংবাদ দেখেও আমাদের অন্তর আল্লাহর আজাবের ভয়ে প্রকম্পিত হয় না। হাশরের ফাইনালের আগে কবরের কথা একবার চিন্তা করুন। ছবাহি মক্তব স্তর থেকে বাচ্চাদেরকে যৌতুক প্রথার কুফল সম্পর্কে অবহিত করুন এবং নিজের অথবা ছেলের বিয়ের সময় জিহ্বা লম্বা না করে কেবলমাত্র সওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে যথাযথভাবে ইসলামী পদ্ধতি অনুসরণ করার চেষ্টা করুন। মানুষের সমালোচনার ভয় করবেন না। কারণ, সমাজে মানুষ নামধারী প্রাণীর অভাব নেই কিন্তু পরকাল ভয়কারী প্রকৃত মানুষের সংখ্যা একেবারে নগণ্য। আসুন, আমরা সবাই মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি, যৌতুক বর্জন করি।
সাংবাদিক ও কলামিস্ট