শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে দেশব্যাপি মৌসুমি ফসল এবং শাক-সবজি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষককে অনেক বেগ পেতে হবে। কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতিতেও পড়বে এর বিরূপ প্রভাব। এর ফলে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা কমে যাওয়া; সবজির দাম বৃদ্ধি এবং আম ও লিচুসহ অন্যান্য মৌসুমী ফলের উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেয়ার আশঙ্কা করছেন দেশের কৃষি বিশেষজ্ঞরা। […]
শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে দেশব্যাপি মৌসুমি ফসল এবং শাক-সবজি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষককে অনেক বেগ পেতে হবে। কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতিতেও পড়বে এর বিরূপ প্রভাব। এর ফলে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা কমে যাওয়া; সবজির দাম বৃদ্ধি এবং আম ও লিচুসহ অন্যান্য মৌসুমী ফলের উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেয়ার আশঙ্কা করছেন দেশের কৃষি বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, এই শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে কৃষক কি ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে- সে ব্যাপারে সরকারের উচিত একটি জরিপ চালানো। যাতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সরকারের সহায়তায় তার আর্থিক ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারে। উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশের অধিকাংশ জেলার ওপর দিয়ে এই শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। গত এক সপ্তাহ থেকে চলা তীব্র দাবদাহ শেষে এই বৃষ্টি জনজীবনে অনেকটা স্বস্তি বয়ে আনলেও এর ফলে বিপর্যস্ত হয়েছে দেশের কৃষি খাত।
এদিকে দেশব্যাপি হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে নওগাঁর পতিœতলায় গাছের ডাল ভেঙে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই এলাকায় দেয়াল চাপা পড়ে আহত হয়েছেন আরও ২ জন। কুমিল্লার দাউদকান্দি, চান্দিনা, তিতাস, হোমনা, মেঘনা, মুরাদনগর ও দেবিদ্বার উপজেলায় মৌসুমী ফসল ও শাক-সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। টাঙ্গাইলের সখিপুরে ২ হাজার একর ধানক্ষেত, ঘর-বাড়ি, সবজি, গাছপালা বিধ্বস্ত হয়েছে। পাশাপাশি শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে এলাকার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। শুধু সখিপুর নয়; টাঙ্গাইলের মির্জাপুরসহ অন্যান্য এলাকায় শিলাবৃষ্টিতে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এদিকে ঝড়ো বাতাসে তিন ঘণ্টা দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট বন্ধ হয়েছিল। ফলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলের সাথে কয়েকঘণ্টা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। এ সময় দুর্ঘটনা এড়াতে ফেরি, লঞ্চসহ সকল প্রকার নৌ-যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে রাজশাহী অঞ্চলের আম, লিচু, গমসহ বিভিন্ন সবজি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানের মত বাগেরহাটে শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে এই শিলাবৃষ্টির কারণে গ্রীষ্মকালীন ফসলসহ বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হবে বলে জানান বাগেরহাট সদর উপজেলার গোড়াপাড়া গ্রামের কৃষক আলামিন।
কৃষকদের মতে, এই সময়ে শিলাবৃষ্টি তাদেরকে মাথায় হাত বসিয়ে দিয়েছে। ফসল নিয়ে তাদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। শুধু বোরো ধান নয়; পাট, তিলসহ অন্যান্য মৌসুমী ফসলসহ শাক-সবজির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এছাড়া বিপাকে পড়েছেন দেশের আম, লিচু চাষিরা। কয়েকদিনের টানা খরার কারণে আমের মুকুল ঝরে পড়ার পর শিলাবৃষ্টিতে হতাশ হয়ে পড়েছেন আম ও লিচু চাষিরা। আম চাষিরা এখন আমের ফলন তো দূরের কথা, স্বাভাবিক ফলন নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। আম চাষিদের মতে, গাছে মুকুল দেখে বাম্পার ফলন আশা করেছিলেন, বাগান মালিকরা। কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় আমের মুকুল ও গুটি ঝরে পড়েছে। এর পরে বর্তমানে গাছে যে আম রয়েছে, শিলাবৃষ্টিতে সে আমের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
অনেকদিন থেকে দেশব্যাপি বৃষ্টি না হওয়ায় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এবং কৃষি জমির পানির স্তর নিচে চলে যাওয়ায় কৃষকরা বৃষ্টির আশা করে আসছিলেন। এছাড়াও দেশব্যাপি পানি ও পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দিসহ অন্যান্য রোগ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই বৃষ্টি আশা করছিলেন। কিন্তু স্বস্তির বৃষ্টি হলেও কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে বিপাকে পড়ে মানুষ। ফসলের ভালো ফলনতো দূরের কথা এখন পথে বসতে যাচ্ছেন কৃষকরা।
যদিও আবহাওয়াবিদদের আগে থেকেই পূর্বাভাস ছিল যে কোন সময় বৃষ্টি ও ঝড়ো বৃষ্টি হতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝড়ো বৃষ্টির সাথে শিলাবৃষ্টি হয়। শুধু ওই সময়েই নয় মধ্যরাতেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে ঝড়ো বৃষ্টির সাথে তুমুল শিলাবৃষ্টি হয়। এতে মৌসুমী ফসল এবং শাক-সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়। আর এতে করে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। বিশেষ করে ধানের ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি। গাজীপুরের কৃষক হাজী তাইজুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, পাকা ধানের ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, এমনিতেই সারা বছর অনাবৃষ্টিতে পানির খরচ অনেক বেশি পড়েছে। আর এখন আবার ধান কাটার সময় শিলাবৃষ্টি অনেক ক্ষতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে কৃষকদের। এদিকে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই গতকাল রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দমকা হাওয়াসহ কালবৈশাখী ঝড় হয়েছে। বৃহস্পতিবারের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ঢাকা, সিলেট, রংপুর, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় বজ্রসহ মাঝারি বা তীব্র কালবৈশাখী ঝড়ের আভাস দিয়েছিল অধিদপ্তর।
সাবেক সচিব ও বার্কের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. জহুরুল করিম বলেন, শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে টমেটো, গাজর, ফুলকপি, বাধাকপি বেগুনসহ অন্যান্য সবজির সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিবে। আকাশ ছোঁয়া দাম হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি বোরো ধানের ক্ষেত্রে বলেন, যে সকল এলাকায় আগাম বোরো ধান উঠার কথা রয়েছে সেখানে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে হাওড় এলাকার ধান চিটা হয়ে যাবে। একই সঙ্গে ঝড়ো বৃষ্টির কারণে যেখানে ধান আঘাতপ্রাপ্ত হবে সেখানে ফলন কমে যাবে। তিনি এক্ষেত্রে কৃষকদের স্বার্থে সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণ করে প্রণোদনার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। যাতে করে কৃষকরা কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সক্ষম হয়। এদিকে শিলাবৃষ্টির কারণে বেশিরভাগ আমের মুকুলই ঝড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক ও সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল এন্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসের উপদেষ্টা মুজাদ্দেদ আল ফারুক জানান, শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে আম বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে আমের মুকুল ঝড়ে পড়েছে। এর ফলে আম চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে। আমের ফলন কমে যাবে। একই সঙ্গে আগাম বোরো ধানের ফলনও কমে যাবে এবং ধানে চিটা দেখা দিবে। ধানের ফলনের লক্ষ্যমাত্রায় ঘাটতি দেখা দিবে। এছাড়া সবজিসহ মৌসুমী ফসলের ব্যাপক ক্ষতির ফলে কৃষকরা আর্থিকভাবে চরম বিপর্যয়ে পড়বে বলে মনে করেন। যার ফলে বাজারে সবজির দাম আকাশ ছোঁয়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে, অনেকের মতে কিছুদিন থেকে প্রচ- গরমের মধ্যে গতকাল রাতের হঠাৎ বৃষ্টি জনজীবনে অনেকটা স্বস্তি এনে দেয়। অনেককেই আনন্দে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখা গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র দাবদাহে ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দিসহ পানি ও পানি বাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে গিয়েছিল। স্বস্তির এই বৃষ্টির ফলে কিছুটা হলেও মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।