স্টাফ রিপোর্টার : সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনগতভাবে নির্দলীয় হলেও মূলত রাজনীতিক দল সমর্থিত নেতা ও ব্যক্তিরা অংশ নিয়ে থাকেন। স্থানীয় সরকার-বিষয়ক রাজনীতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞ অনেকের মতে, আইনের পরিবর্তন এনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করা উচিত। তাঁরা বলছেন, যেহেতু নির্দলীয় এই নির্বাচনে পরোক্ষভাবে দলীয় প্রার্থীরা অংশ নেন, কাজেই এই ‘পারস্পরিক বিরোধিতা’ রাখার প্রয়োজন […]
স্টাফ রিপোর্টার : সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনগতভাবে নির্দলীয় হলেও মূলত রাজনীতিক দল সমর্থিত নেতা ও ব্যক্তিরা অংশ নিয়ে থাকেন। স্থানীয় সরকার-বিষয়ক রাজনীতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞ অনেকের মতে, আইনের পরিবর্তন এনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করা উচিত। তাঁরা বলছেন, যেহেতু নির্দলীয় এই নির্বাচনে পরোক্ষভাবে দলীয় প্রার্থীরা অংশ নেন, কাজেই এই ‘পারস্পরিক বিরোধিতা’ রাখার প্রয়োজন নেই।
২০০৮ সালে প্রকাশিত সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিধিমালার তিন নম্বর ধারায় বলা হয়, ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচন রাজনীতিক দল ভিত্তিক হবে না এবং নির্বাচনি প্রচারণায় কোনো রাজনীতিক দলের নাম, প্রতীক বা কোনো রাজনীতিক ব্যক্তিত্বের নাম বা ছবি ব্যবহার করা যাইবে না।’ এরপর আর কোনো বিধিমালা জারি না হওয়ায় সর্বশেষ ওই আইনই বলবৎ।
২০১৪ সালের ৩ মার্চ রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘যাঁরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নির্দলীয় রাখতে চান, তাঁরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। দলীয় সমর্থনে নির্বাচন হলে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে স্থানীয় সরকার আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। আইনটি সংশোধনে সংসদে একটি বিল উত্থাপন করা হবে।
পরদিন ৪ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই বলে মন্তব্য করেন সৈয়দ আশরাফ।
ওই বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ভবিষ্যতে উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার চিন্তাভাবনা চলছে। কারণ এসব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তাঁরা মূলত কোন না কোন দলের সমর্থন নিয়েই নির্বাচন করেন।
জানতে চাইলে সাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন তো সবাই দলীয়ভাবে অংশ নেয়। তাই এই আইনের পরিবর্তন হওয়া উচিত। এটাকে নির্দলীয় বোরকা পরানোর কোনো দরকার নেই।’ সরকার এই আইন পরিবর্তনের জন্য চিন্তাভাবনা করছে বলেও জানান তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক দলের বাইরে সমাজে অনেক ব্যক্তি আছে। তাদের সুযোগ দিতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে করার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। কিন্তু বর্তমানে সেটা আর নেই। সবাই দলীয় মনোনয়নে এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তবে দলীয়ভাবে এই নির্বাচন করতে হলে আইনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন নির্বাচন কাজ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। গত শনিবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে সুজনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিটি নির্বাচনে রাজনীতিক দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হলে ফলাফল প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে দলীয় মনোনয়নের ফলে আগ্রহ থাকলেও অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। এতে ভোটাররা যোগ্য প্রার্থী বাছাই করার সুযোগ থেকে বঞ্ছিত হন।
সংগঠনটির সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, অফিশিয়ালভাবে না হলেও আনঅফিশিয়ালি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনীতিক দলগুলো প্রার্থী দেয়। এ নির্বাচন দলীয়ভাবে করতে হলে আইন পরিবর্তন করতে হবে। তা তো করে না! তবে স্থানীয় সরকার নানা কারণে নির্দলীয় করার পক্ষে মতো দেন তিনি।
এ ব্যাপারে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ টি এম শামসুল হুদা বলেন, ‘ভারতের পঞ্চায়েতসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করা হয়। আপনি এটাকে (স্থানীয় সরকার নির্বাচন) বলবেন নির্দলীয়, আবার অংশ নেবেন দলীয়ভাবে, এটা তো হতে পারে না। পারস্পরিক এই বিরোধ রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশনের জন্য তাই এই নির্বাচন ম্যানেজ (ব্যবস্থাপনা) কঠিন হয়ে পড়ে।’ তিনিও স্থানীয় সরকার আইন পরিবর্তনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করাই বাস্তবসম্মত বলে মন্তব্য করে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে যে খেল শুরু হয়েছে, তা আর নির্দলীয় রাখা যাবে না। দলীয়ভাবে এ নির্বাচন করাই বাস্তবসম্মত।
বর্তমান কাঠামোয় দলীয়ভাবে এ নির্বাচন করা ঠিক হবে না বলে মতো দেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কাঠামোয়। বর্তমান পদ্ধতি বিদ্যমান রেখে দলীয়ভাবে এ নির্বাচন করলে তা ভয়ংকর হবে। এজন্য সরকারকে আইন পরিবর্তন করে এ কাঠামো বদলে সংসদীয় কাঠামো করতে হবে। যেমন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সংসদীয় পদ্ধতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা হয়। তাঁর মতে, যখন সংসদীয় পদ্ধতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষ এর সুফল পেতে শুরু করবে।