Advertise with us
সম্পূর্ণ নিউজ nobodharanews

বাংলাদেশি স্থানীয় সংবাদ
১১:০০ পিএম, ২৮ জুলাই ২০১৯

ছেলের লাশ দেশে আনতে ভিক্ষা করেছে মা

কালো বোরকা পরা ভদ্রমহিলার নাম হুরিয়া বেগম। মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলায় গেলে তাকে পাওয়া যাবে, গ্রামের নাম দেউলি। গত বছরের ঠিক এই সময়টাতে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এলাকার স্কুল আর অফিস-আদালতে ঢুঁ মারতেন তিনি, সহজ বাংলায় বললে, ভিক্ষা করতেন। আড়াই লাখ টাকার খুব প্রয়োজন ছিল তার, তাই বাধ্য হয়ে নেমেছিলেন পথে, হাত পেতেছেন মানুষের দুয়ারে। দুয়েকদিনের […]

ছেলের লাশ দেশে আনতে ভিক্ষা করেছে মা
নিউজ ডেস্ক
৪ মিনিটে পড়ুন |

কালো বোরকা পরা ভদ্রমহিলার নাম হুরিয়া বেগম। মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলায় গেলে তাকে পাওয়া যাবে, গ্রামের নাম দেউলি। গত বছরের ঠিক এই সময়টাতে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এলাকার স্কুল আর অফিস-আদালতে ঢুঁ মারতেন তিনি, সহজ বাংলায় বললে, ভিক্ষা করতেন।

আড়াই লাখ টাকার খুব প্রয়োজন ছিল তার, তাই বাধ্য হয়ে নেমেছিলেন পথে, হাত পেতেছেন মানুষের দুয়ারে। দুয়েকদিনের মধ্যেই টাকাটার ব্যবস্থা করতে হতো, অথচ সপ্তাহখানেক ঘুরে কেবল বিশ-একুশ হাজার টাকা জোগাড় করতে পেরেছিলেন তিনি। তবে হুরিয়া বেগমের ভিক্ষা করার কথা ছিল না। করুণ একটা গল্প আছে তার, সময় থাকলে শুনতে পারেন।

নদীভাঙনে কয়েক দফায় সর্বস্ব খুইয়েছেন হুরিয়া বেগম। ভাগ্য তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে বার বার। যখনই সংসারটাকে একটু গুছিয়ে নিয়েছেন, তখনই ভিটেবাড়ি সব কেড়ে নিয়েছে নদী। স্বামী-সন্তান নিয়ে সংসার ছিল, সেখানে সমৃদ্ধি না থাকলেও, খানিকটা সুখের ছোঁয়া তো ছিলোই। কিন্ত দারিদ্র‍্যতার কষাঘাত থেকে মুক্তি পেতে তার ছেলে শাহ আলম যেতে চাইলো মধ্যপ্রাচ্যে।

ছেলের অনাগত ভবিষ্যত আর পরিবারের কথা ভেবে বাধা দিতে পারেননি স্বামী-স্ত্রী কেউই। এছাড়া আর উপায়ও ছিল না কোন। এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নেয়া হলো, ধার করা হলো আত্নীয় স্বজনের কাছ থেকে। ২০১৭ সালের আগস্টের নয় তারিখে সৌদি আরবের বিমানে চড়েছিলেন শাহ আলম। চোখের জলে ছেলেকে বিদায় জানিয়েছিলেন হুরিয়া বেগম।

সৌদি পৌঁছে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছিল শাহ আলম। বেতন যা পেতো, সেটা থাকা-খাওয়াতেই চলে যেতো, ধার-দেনা শোধ তো দূরে থাকুক, বাড়িতে পাঠানোর মতো টাকাও জমতো না। তাতে অবশ্য হুরিয়া বেগম বা তার স্বামী সায়েন উদ্দিনের কোন আপত্তি ছিল না। বুড়োবুড়ি দুজনে শাকপাতা খেয়ে দিন পার করে দিচ্ছিলেন। দুনিয়ার কাছে তাদের চাওয়ার কিছু ছিল না, শুধু চাইতেন, দূরদেশে তাদের ছেলেটা যাতে ভালো থাকে।

হুরিয়া বেগমকে নিয়ে ভাগ্য সারাটা জীবন ছিনিমিনি খেলেছে, এই বেলায় সে আরও নিষ্ঠুর হলো। সাল ২০১৮, জুলাই মাসের ৪ তারিখে সৌদি আরব থেকে ফোন এলো, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে শাহ আলম! হুরিয়া বেগম আর সায়েন উদ্দিনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। সুস্থ সবল জোয়ান ছেলেটাকে বিদেশ পাঠালেন কয়দিন আগে, দিন দুয়েক আগেও যে ছেলে ফোনে তাকে জানিয়েছে, আগস্ট মাস থেকে বাড়িতে টাকা পাঠাবে- সেই ছেলে এভাবে মরে যেতে পারে!

চোখের পানি ফেলারও সময় পেলেন না দুজনে, তাদের জানানো হলো, জেদ্দা থেকে শাহ আলমের লাশ দেশে আনতে হলে লাগবে আড়াই লাখ টাকা। নইলে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে তাকে দাফন করা হবে সৌদি আরবেই।

দশমাস গর্ভে ধারণ করে ছেলেকে জন্ম দিয়েছেন, দশ মাস আগে পাশে বসিয়ে গরম ভাত খাইয়ে ঢাকার বাসে তুলে দিয়েছেন, নিজের নাড়িছেঁড়া ধনকে শেষবারের মতো দেখতে পারবেন না, একবার ছেলের মুখটা ধরে আদর করার সুযোগ পাবেন না- এটা হুরিয়া বেগম মানতে পারলেন না। তিনি জানালেন, যেভাবেই হোক, টাকার ব্যবস্থা করবেন। ছেলের লাশ যেন সৌদিতে দাফন করা না হয়।

আত্নীয় স্বজনদের কাছে আবার হাত পাতলেন হুরিয়া। এবার আর কেউ টাকা ধার দিলো না, কারণ আগের ধারদেনাই শোধ হয়নি। উপায়ন্তর না দেখে ভিক্ষা করতে রাস্তায় নামলেন। ছেলের লাশটা দেশে আনার জন্যে ভিক্ষা করছেন একজন মা- এরচেয়ে করুণ দৃশ্য আপনারা কখনও দেখেননি, আমি বাজী ধরে বলতে পারি।

স্কুলের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে অফিসের কর্মচারী, সবাইকে নিজের কষ্টের কথা বলছেন হুরিয়া, শুনে কেউ অল্পস্বল্প সাহায্য করছে, কেউ হয়তো পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। কষ্টের গল্প আজকাল লোকজনকে টানে না, তারচেয়ে গুজবের গল্পগুলো লোকজন বেশি খায়।

হুরিয়া বেগম পড়ালেখা করার সুযোগ পাননি, তিনি জানতেন না, সরকারের কোন দপ্তরে গেলে তিনি সাহায্য পাবেন। লোকজনের পরামর্শে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েছেন, সেখানে কেঁদে কেঁদে হুরিয়া বেগম বলেছেন, ‘আমার মনিরে একটু শেষবারের মতো দেখতে দেন আপনারা!’

এতক্ষণ যে ঘটনাটা পড়লেন, সেটা ২০১৮ সালের। হুরিয়া বেগম শেষমেশ ছেলের লাশটা দেখতে পেয়েছিলেন, অনেক দৌড়-ঝাঁপ আর ফাইল চালাচালির পরে প্রবাসী কল্যান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শাহ আলমের মৃতদেহ আনা হয়েছিল দেশে। মারা যাওয়ার দুই মাস দুইদিন পরে ৬ই সেপ্টেম্বর নিজের জন্মস্থান দেউলিতে দাফন করা হয়েছিল তাকে। চোখের জলে ছেলেকে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন হুরিয়া বেগম।

আমরা জানি না হুরিয়া বেগম এখন কেমন আছেন, টাকার জন্যে পাওনাদারেরা তাকে বিরক্ত করে কিনা, কিভাবে তার দিন কাটছে। তার কথা ভেবে কয়েক মিনিটের জন্যে মন খারাপ করা ছাড়া আর তেমন কিছুই করার নেই আমাদের…

সূত্র: দশ দিগন্ত

Facebook Comments Box
Advertise with us
এ বিভাগের আরও খবর

প্রাণ হাতে নিয়ে ইউরোপ!
৫ বছর আগে
অস্ট্রেলিয়ান সংবাদ
রাজশাহীর ‘কলাই রুটি’
৫ বছর আগে
বাংলাদেশি সংবাদ

Advertise with us
Advertise with us
আরও nobodharanews সংবাদ


Design and Development by : webnewsdesign.com